চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক: অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, আন্তর্জাতিক মহল বর্তমান সরকারকে শুধু সমর্থন নয়, সমর্থনকে কাজে লাগানোর জন্য সর্বাত্মক সহায়তা করছে।
তিনি বলেন, আমরা ব্যর্থ হতে চাই না। সমাজে নানাজন নানা মত তো থাকবেই। সংস্কার কমিশন দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে সুপারিশমালা তৈরি করেছে। এটি মূল্যবান সম্পদ। এ সম্পদ বাংলাদেশের ইতিহাসে রক্ষিত থাকবে। তাদের সুপারিশ বাস্তবায়নে সবাই মিলে মতামত ও দিকনির্দেশনা দেবেন। এটা কারো একার বাংলাদেশ না সবার বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, প্রয়োজনে আপনারা নিজেরা আলোচনা করুন। সবাই মিলে নীতিমালা ও আইন-কানুন একবার করে দিলে তা বছরের পর বছর চলতে থাকবে।
শনিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর বেইলি রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রথম বৈঠকের প্রারম্ভিক বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সর্বসম্মতিক্রমে যে আইন-কানুন তৈরি হবে তা হবে ট্রান্সপারেন্ট। তখন খেলায় জিতলে কেউ সন্দেহ করবে না যে কেউ জিতিয়ে দিয়েছে।
তিনি বলেন, এখন যে খেলা চলছে তাতে জিতলেও সন্দেহ লাগে। বোধহয় কোথা থেকে কলকাঠি নেড়ে জিতিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ কলকাঠি নাড়ার বিষয়টি আমাদের মনের মধ্যে গেঁথে গেছে। কলকাঠি ছাড়া যে একটা নিয়মে দেশ চলতে পারে তা মানুষ ভুলে গেছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনের বিষয়ে তিনি বলেন, একটি প্রতিবেদন সারা পৃথিবী বদলে গিয়েছে। আর কত সমর্থন চাই আমরা। একেবারে অক্ষরে অক্ষরে বলে দিয়েছে কোথায় কীভাবে মেরেছে, এর থেকে বের হওয়ার তো কারও উপায় নাই। বাংলাদেশকে ঘিরে যে অপপ্রচার চলছিল, এই এক প্রতিবেদন সমস্ত সমাপ্ত। বলতে পারবে, কিন্তু কোনো আওয়াজ বের হবে না। আরও অন্যান্য যেসব প্রতিষ্ঠান প্রতিবেদন তৈরি করেছে তাদের (আওয়ামী লীগের) প্রতিবেদনে অত্যন্ত জোরালোভাবে তাদের অপরাধের কথা উঠে এসেছে।
আয়নাঘরের নির্মমতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা সেদিন আয়নাঘরে গেলাম, মানুষ কত নির্মম হতে পারে, বীভৎস দৃশ্যের সৃষ্টি করতে পারে, নৃশংস হতে পারে, এর চেয়ে বড় নমুনা বোধ হয় পাওয়া যাবে না। আমাদের শুধু দেখতে কষ্ট লেগেছে, যারা বছরের পর বছর সেখানে থেকেছে তাদের প্রতিটি বর্ণনা, অভিজ্ঞতা গুম তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পরে দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিকভাবে মানুষ প্রথম বুঝতে পারলো আমরা কিসের কথা বলছি, আমরা কোথা থেকে এসেছি।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থনের কারণে বিরোধী পক্ষ সুবিধা করতে পারছে না জানিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, একই সঙ্গে আপনাদের সমর্থন, আন্তর্জাতিক বিশ্বের সমর্থন, সারা পৃথিবী জুড়ে আমাদের একটা বড় রকম সমর্থন গড়ে উঠেছে। যে কারণে অপর পক্ষ সুবিধা করতে পারছে না। পদে পদে ব্যাহত হচ্ছে যেখানে যায়। বহু গল্প করছে, গল্প টেকাতে পারছে না। শেষমেশ তো ট্রাম্পকে নিয়ে গল্প, সে অপপ্রচার চালাতে গিয়ে চালাতে পারলো না। আন্তর্জাতিক সমর্থনের বা দেশিয় সমর্থনের কথা বলতে গেলে মনটা বড় হয়ে যায়।
ড. ইউনূসের দ্বিতীয় ইনিংস শুরু
এত আন্তর্জাতিক সমর্থন ও অভ্যন্তরীণ সমর্থনের পরও নতুন বাংলাদেশ গড়তে না পারা হবে কর্মের দোষ বলেও মন্তব্য করেন ইউনূস।
তিনি বলেন, আমরা এ সুযোগ ছাড়তে চাই না। যত ছোট-বড়-মাঝারি-ধনী রাষ্ট্র সবাই মিলে সমর্থন দিয়েছে। কেউ কোনো রকম দ্বিধা নাই। তাদের ভাষা শুনলে আমি অবাক হই। আমরা যখন বসি, বিস্তারিত জানার আগে বলে আমরা আপনাদের সঙ্গে আছি। এ পর্যন্ত তারা সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে এবং ক্রমাগতভাবে তাদের সমর্থন বাড়ছে।
সবার মধ্যে ঐক্য ধরে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, আমাদের মধ্যে অনেক তর্ক-বিতর্ক করার, দূরত্ব সৃষ্টি করার মতো প্রবণতা আছে। কিন্তু এই একটি জায়গায় এক ছিলাম, এখনো এক আছি। আগামীতেও আমরা এক থাকবো। সে বিশ্বাস আমার আছে।
বিরোধী শক্তির বিষয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, হাঙ্গামা হবে, কারণ যাদেরকে বাংলাদেশের মানুষ তাড়িয়ে দিয়েছে, অস্বীকার করেছে, ত্যাগ করেছে, তারা ফিরে আসার জন্য অত্যন্ত ব্যাকুল। প্রতিটি দিন তাদের জন্য মূল্যবান, দেরি হলে তাদের জন্য অসুবিধা। সেই জন্য আমাদের সবাইকে শক্ত থাকতে হবে, মজবুত থাকতে হবে, আমরা যেগুলো আলাপ করছি সেগুলোয় মতভেদ থাকবে, কিন্তু এর অর্থ এই নয় আমরা একত্র নই। আমরা একত্র থাকবো।
অন্তর্বর্তী সরকার দ্বিতীয় অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে মন্তব্য করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ছয় মাসে প্রথম ইনিংস বা প্রথম অধ্যায় শেষ হয়েছে। আজ রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হলো। যেভাবে আমরা প্রথম অধ্যায় শেষ করলাম, দ্বিতীয় অধ্যায়ে আমরা যদি সেটা ঠিক রাখতে পারি, তৃতীয় অধ্যায়ের জন্য আমাদের কোনো চিন্তা নাই। প্রথম অধ্যায়ে যে সমস্ত শক্তি আমাদের ব্যাহত করার চেষ্টা করেছে, আমাদের ভণ্ডুল করার চেষ্টা করেছে, তাদেরকেও সুন্দরভাবে, সবাই মিলে মোকাবিলা করতে পেরেছি।
চাটগাঁ নিউজ/জেএইচ