ওবায়দুল হক পিবলু, পটিয়া প্রতিনিধি : চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায় গত তিন মাসে প্রেমঘটিত কারণে অন্তত ২৩ থেকে ২৪ জন নারী ও তরুণী পরিবারের অগোচরে বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা। নিখোঁজের অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশের বিশেষ অভিযানে এ পর্যন্ত ১৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে পটিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় প্রেমের টানে পরিবারের অজান্তে বাড়ি ছাড়ার প্রবণতা বেড়েছে। যাদের অধিকাংশই স্কুল-মাদ্রাসা পড়ুয়া। অনেক ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় ও সম্পর্ক গড়ে ওঠার পর তরুণ-তরুণীরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় নিখোঁজের অভিযোগ করা হলে পুলিশ তাদের অবস্থান শনাক্ত করে উদ্ধারের উদ্যোগ নেয়।
গত প্রায় তিন মাসে এমন একাধিক ঘটনায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে ১৬ জনকে উদ্ধার করেছে। উদ্ধার হওয়া নারীদের অনেককে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে এসব ঘটনার পেছনে পারিবারিক দূরত্ব, সন্তানদের প্রতি পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং বয়সসন্ধিকালের আবেগকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উপজেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চালিয়ে এ ধরনের ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের বিষয়টি জড়িত। তারা এটিকে সামগ্রিক সামাজিক অবক্ষয়ের একটি লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সম্মিলিতভাবে সচেতনতা তৈরির আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফারহানুর রহমান বলেন, ঘর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, এটা সামাজিক সমস্যা। এটা ফৌজদারি অপরাধও। তবে যারা পালিয়ে যাচ্ছে, তাদের বেশিরভাগ অপ্রাপ্ত বয়স্ক। ফলে তাদের বিষয়গুলো শিশু আইনে বিবেচনা করতে হয়। তবে ইদানিং এই ধরণের অপরাধ বা ঘটনা ঘটানোর প্রবণতা বেড়েছে। এর জন্য পরিবার এবং সামাজিক পরিবেশ-পরিস্থিতি অনেকাংশে দায়ী। একজন স্কুল পড়ুয়ার হাতে উন্নত প্রযুক্তির মোবাইল থাকছে। এই মোবাইলই তরুণ-তরুণীদের বিপৎগামী করে তুলছে। কাজেই পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আরও নজরদারি বাড়াতে হবে।
অভিভাবকদের মতে, সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে তাদের চলাফেরা ও অনলাইন যোগাযোগ সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো তরুণ-তরুণী নিখোঁজ হলে বিষয়টি গোপন না রেখে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
পটিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মো. জিয়াউল হক বলেন, স্কুল কলেজ পড়ুয়া মেয়েরা আবেগের বশে কারও প্ররোচনায় পড়ে ঘর ছাড়ছে, এটা খুবই উদ্বেগের বিষয় এবং সামাজিক অবক্ষয় বলতে হবে। এই অবক্ষয় থেকে রেহায় পেতে হলে পরিবারে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা জোরদার করতে হবে।
তিনি বলেন, পরিবারের অগোচরে যখন ছেলে ঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়, অভিভাবকরা আমাদের কাছে ছুটে আসেন। তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় অবস্থান শনাক্তসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়ার নাম করে কোথায় যাচ্ছে, কাদের সঙ্গে মিশছে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে।
সচেতন মহলের মতে, প্রেমঘটিত কারণে বাড়ি ছাড়ার ঘটনা শুধু একটি পরিবারের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে নিরাপত্তা, পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক মূল্যবোধের বিষয়ও জড়িত। তাই এ প্রবণতা রোধে পরিবার, প্রশাসন, পুলিশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
চাটগাঁ নিউজ/এসএ






