‘সম্পদের সঙ্গে দায়িত্ববোধ: নীরবে মানুষের পাশে কেএসআরএমের মো. শাহজাহান’

নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রামের শিল্পাঙ্গনে পরিচিত একটি নাম মো. শাহজাহান। কেএসআরএমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং রয়েল সিমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে ব্যবসা-বাণিজ্যে তাঁর পরিচিতি বিস্তৃত। কিন্তু শিল্পপতি পরিচয়ের বাইরে তাঁর আরেকটি পরিচয় দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার বাইরে থেকেছে—নিজ এলাকার অসহায় মানুষের পাশে নীরবে দাঁড়ানো একজন সমাজসেবী হিসেবে।

সাতকানিয়া উপজেলার নলুয়া ইউনিয়নের পূর্ব গাটিয়াডেঙ্গার সন্তান মো. শাহজাহানের শৈশব-কৈশোর কেটেছে গ্রামীণ পরিবেশে। সেই শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক এখনো অটুট। স্থানীয়দের ভাষ্য, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এলাকার মানুষের প্রয়োজনের সময়ে পাশে দাঁড়ানো তাঁর দীর্ঘদিনের অভ্যাস।

কেএসআরএমের ইতিহাসেও রয়েছে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। প্রতিষ্ঠাতা কবির আহমেদের মৃত্যুর পর কলেজপড়ুয়া অবস্থায় পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব নিতে হয় তাঁকে। কেএসআরএমের নিজস্ব প্রকাশিত ইতিহাস অনুযায়ী, ব্যাংকঋণ পেতে নানা বাধার মুখেও তিনি চেষ্টা চালিয়ে যান এবং ১৯৯১ সালে স্ক্র্যাপ বহর আমদানির মাধ্যমে ব্যবসাকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পথে এগিয়ে যান। পরবর্তী সময়ে কেএসআরএম দেশের অন্যতম বড় ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

রয়েল সিমেন্ট লিমিটেডও তাঁর ব্যবসায়িক পরিসরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিষ্ঠানটি কেএসআরএম গ্রুপ ও বিএসএ গ্রুপের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, রয়েল সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহজাহান।

তবে ব্যবসায়িক সাফল্যের গল্পের বাইরে তাঁর গ্রামের মানুষের কাছে পরিচিতি অন্যরকম।

‘নিজের জন্য নয়, মানুষের জন্যও সম্পদ’
স্থানীয়দের ভাষ্য এবং বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সাতকানিয়ার নলুয়া ও আশপাশের এলাকায় অসচ্ছল মানুষের জন্য ঘর নির্মাণ, মসজিদ-মাদ্রাসার উন্নয়ন, চিকিৎসা ও বিয়ের মতো পারিবারিক প্রয়োজনে সহযোগিতা এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার মতো নানা উদ্যোগে যুক্ত ছিলেন মো. শাহজাহান।

২০২৪ সালে প্রকাশিত বণিক বার্তার একটি বিস্তারিত প্রতিবেদনে বলা হয়, মো. শাহজাহান অসংখ্য মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণে সহায়তা করেছেন, অসচ্ছল মানুষের জন্য পাকা বাড়ি নির্মাণ করে দিয়েছেন এবং ডলু নদীতে নিজের অর্থে বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে অনেক মানুষের বসতভিটা রক্ষায় ভূমিকা রেখেছেন। একই প্রতিবেদনে রিকশা-যানবাহন দিয়ে স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করা এবং মেয়ের বিয়ে ও চিকিৎসার ব্যয় বহনের মতো সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

ডলু নদীর ভাঙনপ্রবণ এলাকায় তাঁর উদ্যোগের কথাও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে এসেছে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পূর্ব গাটিয়াডেঙ্গা এলাকায় বসতভিটা রক্ষায় তিনি নিজস্ব অর্থায়নে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বেড়িবাঁধ নির্মাণ করেছিলেন।

অর্থাৎ তাঁর দানের পরিধি শুধু নগদ অর্থ বা খাদ্যসামগ্রী বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; কোথাও তা ঘর, কোথাও অবকাঠামো, কোথাও আবার মানুষের উপার্জনের পথ তৈরি করে দেওয়ার চেষ্টা।

রমজানে বাড়ে সহযোগিতার হাত
রমজান মাসে তাঁর উদ্যোগের কথা সবচেয়ে বেশি শোনা যায়। স্থানীয় সূত্র ও সংবাদ প্রতিবেদনে জানা যায়, প্রতিবছর নলুয়া ও আশপাশের এলাকার অসচ্ছল মানুষের মধ্যে চাল, পোশাক, ইফতারসামগ্রীসহ বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হতো।

২০১৮ সালেও এমন একটি বড় আয়োজনের কথা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। তবে ওই বছর ইফতার ও যাকাতসামগ্রী বিতরণের সময় ব্যাপক জনসমাগমের মধ্যে পদদলিত হয়ে ১০ নারীর মৃত্যু এবং বহু মানুষের আহত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মামলা ও তদন্তও হয়েছিল। বিষয়টি তাঁর জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দুঃখজনক অধ্যায়।

ঘটনার পর দাতব্য সহায়তা বিতরণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার গুরুত্বও সামনে আসে। ফলে কোনো ব্যক্তির সামাজিক অবদান মূল্যায়নের পাশাপাশি বড় জনসমাগমের কর্মসূচিতে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

প্রচারের বাইরে থাকার চেষ্টা
মো. শাহজাহানকে নিয়ে স্থানীয় মানুষের যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তার একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য—তিনি প্রচারের চেয়ে কাজকে গুরুত্ব দেন।

মহিম চৌধুরী নামে একজন ব্যক্তি তাঁর ফেসবুক পোস্টে মো. শাহজাহানের বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের স্মৃতিচারণ করেছেন। তিনি শৈশবে গাটিয়াডেঙ্গায় আয়োজিত বড় মেজবানের কথা স্মরণ করে লিখেছেন, এলাকার অসহায় মানুষের জন্য তাঁর নানা সহযোগিতার অনেক কিছুই হয়তো সাধারণ মানুষের অজানা থেকে গেছে।

মহিম চৌধুরীর সেই স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে, ছোটবেলার সেই মেজবান শুধু খাবারের আয়োজন ছিল না; স্থানীয় মানুষের কাছে সেটি ছিল একটি সামাজিক মিলনমেলার মতো। সময়ের ব্যবধানে সেই আয়োজন স্মৃতিতে পরিণত হলেও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গল্পগুলো রয়ে গেছে।

দানের দর্শন: ‘ডান হাতের দান যেন বাম হাত না জানে’
মো. শাহজাহানের সামাজিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে যারা কথা বলেন, তারা প্রায়ই তাঁর ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রসঙ্গটি সামনে আনেন। ইসলামে গোপনে দান করার যে শিক্ষা রয়েছে, সেটিকেই তাঁর অনেক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন স্থানীয়রা।

এই দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি বিষয় হলো—ব্যক্তিগত প্রচারের বদলে প্রয়োজনের সময়ে সহায়তা করা। কারও ঘর দরকার, কারও চিকিৎসা, কারও মেয়ের বিয়ে, কারও জীবিকার ব্যবস্থা—সহায়তার ধরনও তাই একেক ক্ষেত্রে একেক রকম।

একজন শিল্পোদ্যোক্তার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি সামাজিক মাত্রা। কারণ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান যেখানে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করে, সেখানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে সমাজের দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো তৈরি করে আরেক ধরনের সামাজিক সম্পর্ক।

শিল্পপতি থেকে মানুষের ‘আপনজন’ মো. শাহজাহান
কেএসআরএমের নিজস্ব ইতিহাসে মো. শাহজাহানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটির বিস্তারের কথা উল্লেখ রয়েছে। ১৯৮৪ সালে শুরু হওয়া পারিবারিক ব্যবসা পরবর্তীতে আধুনিক ইস্পাত শিল্পে রূপ নেয়। বণিক বার্তার ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে কেএসআরএমের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর ও শিল্পাঞ্চলকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে কেএসআরএমের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য। ২০২৪ সালে এমভি আবদুল্লাহর নাবিকেরা দেশে ফেরার সময় কেএসআরএম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান তাঁদের অভ্যর্থনা জানান। কিন্তু তাঁর গ্রামের মানুষের কাছে এসব পরিচয়ের চেয়েও বড় পরিচয় সম্ভবত অন্যটি—তিনি ‘নিজেদের মানুষ’।

সাতকানিয়ার নলুয়া, পূর্ব গাটিয়াডেঙ্গা কিংবা ডলু নদীর পাড়ে তাঁর নাম উচ্চারিত হলে শিল্পপতি মো. শাহজাহানের পাশাপাশি উঠে আসে একজন সহযোগী মানুষের গল্প; যিনি সামর্থ্য অর্জনের পর নিজের শিকড়ের মানুষের কথা ভুলে যাননি।

সম্পদের সঙ্গে দায়িত্ববোধের সম্পর্ক কতটা গভীর হতে পারে, তাঁর কর্মকাণ্ডকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের স্মৃতিগুলো সেই প্রশ্নই সামনে আনে।

অবশ্য একজন মানুষের সামাজিক অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হলে আবেগের পাশাপাশি প্রয়োজন নথিভিত্তিক হিসাব—কতটি ঘর নির্মিত হয়েছে, কতজন চিকিৎসাসহায়তা পেয়েছেন, কতগুলো শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান উপকৃত হয়েছে কিংবা কত অর্থ সামাজিক কাজে ব্যয় হয়েছে—এসবের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা ভবিষ্যতে তৈরি হলে তাঁর সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের ব্যাপ্তিও আরও স্পষ্টভাবে জানা সম্ভব হবে।

তবু মানুষের মুখে মুখে ফিরে আসা গল্পগুলোরও একটি মূল্য আছে। কারণ সব দানের হিসাব খাতায় লেখা থাকে না; কিছু দানের হিসাব থেকে যায় মানুষের স্মৃতিতে। আর সেই স্মৃতিতেই হয়তো মো. শাহজাহানের সবচেয়ে বড় পরিচয়—শুধু একজন শিল্পপতি নন, নিজের এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়ানো এক প্রচারবিমুখ উদ্যোক্তা।

চাটগাঁ নিউজ/এসএ

Scroll to Top