চসিকের সড়কে ২১৩ কোটি টাকা করের বোঝা, বন্ধ ভূমি রেজিস্ট্রি

নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রাম নগরের সড়কের জমি নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও ভূমি প্রশাসনের মধ্যে নতুন করে তৈরি হয়েছে জটিলতা। নগরের বিভিন্ন এলাকায় সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন ও ব্যবস্থাপনাধীন সড়কের ওপর ভূমি উন্নয়ন কর দাবি করেছে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়। গত ৫০ বছরের হিসাবে এক হাজার ৪৪২ কিলোমিটার সড়কের বিপরীতে বকেয়া করের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১৩ কোটি টাকা।

এই বকেয়া পরিশোধের জন্য চসিককে চিঠি দিয়েছে আগ্রাবাদ সার্কেল ভূমি অফিস। তবে আগে কখনো সড়কের ওপর এ ধরনের কর দাবি করা হয়নি—এমন যুক্তিতে বকেয়া পরিশোধে আপত্তি জানিয়েছে চসিক। বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ চেয়েও চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি।

এদিকে বকেয়া আদায়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ভূমি প্রশাসন। চসিকের সঙ্গে সম্পৃক্ত ভূমি রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ভূমি কর পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত দলিল নিবন্ধন না করার জন্য সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এর ফলে চসিকের কাছ থেকে জমি বা ফ্ল্যাট কেনা নাগরিকদের একটি অংশ দলিল নিবন্ধন করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন।

৫০ বছরের করের দাবি
আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার চসিকের প্রায় ১৫ একর ‘নগর সড়কের’ ওপর বছরে ৯৪ হাজার ৩২০ টাকা করে ভূমি কর নির্ধারণ করেছে আগ্রাবাদ ভূমি অফিস। ১৩৮৩ থেকে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত ৫০ বছরের বকেয়া হিসেবে চসিকের কাছে দাবি করা হয়েছে ৪২ লাখ ১১ হাজার ৮৪৮ টাকা।

গোসাইলডাঙ্গা এলাকায় প্রায় সাড়ে ১২ একর সড়কের ওপর বছরে ৭৫ হাজার টাকা কর নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই হিসাবে ৫০ বছরের বকেয়া হিসেবে দাবি করা হয়েছে ১৮ লাখ ৩৬ হাজার ৭৮১ টাকা।

মাদারবাড়ি এলাকায় সাড়ে ১২ একর সড়কের ওপর বছরে ৭৪ হাজার ৫২০ টাকা করে কর ধার্য করা হয়েছে। এ বাবদ ৫০ বছরের বকেয়া দাবি করা হয়েছে ৩৩ লাখ ৪৩ হাজার ৪৬৪ টাকা।

এ ছাড়া বন্দরের আট একর সড়কের ওপর বছরে ৪৯ হাজার ৮০ টাকা করে কর নির্ধারণ করে ৫০ বছরের বকেয়া হিসেবে ২১ লাখ ২৮ হাজার ৮৪৮ টাকা এবং মগবাজারের পাঁচ একর সড়কের ওপর বছরে ৩৬ হাজার টাকা করে ৫০ বছরের বকেয়া হিসেবে ১৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা পরিশোধের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে।

এগুলো কেবল কয়েকটি এলাকার হিসাব। চসিকের দাবি অনুযায়ী, পুরো নগরের এক হাজার ৪৪২ কিলোমিটার সড়কের বকেয়া ভূমি করের পরিমাণ প্রায় ২১৩ কোটি টাকা।

আগে কর নেওয়া হয়নি, এখন কেন?
চসিকের আপত্তির মূল জায়গা এখানেই। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নগরের সড়কগুলো দীর্ঘদিন ধরে জনসাধারণের চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নের দায়িত্বও সিটি করপোরেশন পালন করে আসছে। কিন্তু এসব সড়কের ওপর আগে কখনো ভূমি উন্নয়ন কর দাবি করা হয়নি।

হঠাৎ করে পাঁচ দশকের বকেয়া কর দাবি করায় বিপুল অঙ্কের অর্থের দায় চসিকের ওপর পড়েছে। একই সঙ্গে এত বছর ধরে কর আদায় না করে এখন একসঙ্গে বকেয়া দাবি করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।

চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আমিন বলেন, বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। হঠাৎ কেন এই কর বসানো হলো এবং চসিক এত টাকা কীভাবে পরিশোধ করবে—এসব বিষয়ে আলোচনা করেও সমাধান হয়নি। তাই করণীয় জানতে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

কর আদায়ের চাপ গিয়ে পড়েছে নাগরিকের ওপর
চসিক ও ভূমি অফিসের এই বিরোধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। চসিকের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো জমি, ফ্ল্যাট বা স্থাপনা রেজিস্ট্রি করতে গিয়ে অনেক নাগরিককে ফিরে আসতে হচ্ছে।

মাদারবাড়ির বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, তিনি সিটি করপোরেশন থেকে একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। সেটি রেজিস্ট্রি করতে সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে গেলে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ভূমি কর পরিশোধ না করায় সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর নিষেধাজ্ঞার কথা জানিয়ে ফ্ল্যাটের দলিল নিবন্ধন করা হয়নি। ফলে একটি সরকারি সংস্থার সঙ্গে আরেক সরকারি সংস্থার রাজস্ব-সংক্রান্ত বিরোধের খেসারত দিতে হচ্ছে সেই নাগরিককে, যিনি সংশ্লিষ্ট বিরোধের কোনো পক্ষই নন।

রেজিস্ট্রি বন্ধের আইনি ভিত্তি কতটা প্রযোজ্য?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। ভূমি ও সম্পত্তি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ধরনের কর বা সরকারি পাওনা পরিশোধের প্রমাণ দলিল নিবন্ধনের আগে প্রয়োজন হতে পারে। সরকারি সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের প্রকাশিত তথ্যেও দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন কর ও ফি পরিশোধের বিধান রয়েছে।

তবে চসিকের সড়কের জমির ওপর নতুন করে দাবি করা এই ভূমি কর এবং সেই করকে কেন্দ্র করে চসিক-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সম্পত্তির দলিল নিবন্ধন আটকে দেওয়ার বিষয়টি আলাদা আইনি প্রশ্ন তৈরি করছে। অর্থাৎ একটি সড়কের বকেয়া করের দায়ে চসিকের অন্য সম্পত্তি বা নাগরিকের কেনা ফ্ল্যাটের নিবন্ধন বন্ধ করা আইনগতভাবে কতটা বৈধ ও প্রযোজ্য—এ প্রশ্নের স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

বিশেষ করে করের দাবিটি কোন আইন, বিধি, পরিপত্র বা সরকারি আদেশের ভিত্তিতে করা হয়েছে এবং ৫০ বছরের বকেয়া নির্ধারণের পদ্ধতি কী—তা প্রকাশ্যে স্পষ্ট করা হলে বিরোধটির আইনি ভিত্তি বোঝা সহজ হবে।

ভূমি অফিসও সরকারি কাঠামোর অংশ
আগ্রাবাদ সার্কেল ভূমি অফিস চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভূমি ও রাজস্ব ব্যবস্থার অংশ। সরকারি জেলা পোর্টালে আগ্রাবাদ সার্কেল ভূমি অফিসকে নগরের ভূমি ও রাজস্ব-সংক্রান্ত অফিসগুলোর তালিকায় রাখা হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, আগ্রাবাদ সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে তানভির হাসান তুরান দায়িত্ব পালন করছেন। অর্থাৎ বিরোধটি ব্যক্তিগত কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নয়; একই রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কাঠামোর দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রাজস্ব ও সম্পত্তির অধিকারসংক্রান্ত প্রশ্নকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে।

২১৩ কোটি টাকার প্রশ্ন
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে ২১৩ কোটি টাকা নিয়ে। চসিকের এক হাজার ৪৪২ কিলোমিটার সড়কের ওপর ৫০ বছরের বকেয়া হিসেবে এত বড় অঙ্কের কর কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে—তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব জনসম্মুখে আসা জরুরি।

প্রতিটি সড়কের জমির পরিমাণ, দাগ ও খতিয়ান, জমির শ্রেণি, প্রতি বছর নির্ধারিত করের হার, কোন সময় থেকে কর প্রযোজ্য ধরা হয়েছে এবং কীভাবে সুদ বা বকেয়া হিসাব করা হয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে বিষয়টি নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক অনেকটাই পরিষ্কার হতে পারে।

একইভাবে চসিকের পক্ষ থেকেও কোন কোন সড়ক তাদের নিজস্ব সম্পত্তি, কোনগুলো সরকারি বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের জমি এবং সড়কগুলোর ভূমি-রেকর্ডে মালিকানা কীভাবে নথিভুক্ত রয়েছে—তার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।

শুধু রাজস্ব আদায় নয়, সেবা সচল রাখার প্রশ্ন
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নগরের সড়ক, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আলোকায়নসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা পরিচালনা করে। সংস্থাটির নিজস্ব আয়ও এসব কার্যক্রম পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও নিজস্ব উৎসের আয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে সরকারের ভূমি প্রশাসনের জন্য ভূমি উন্নয়ন কর একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎস। ফলে কর আদায়ের প্রশ্নটি প্রশাসনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুই প্রতিষ্ঠানের বিরোধের কারণে যদি জমি ও ফ্ল্যাটের দলিল নিবন্ধনের মতো নাগরিক সেবা আটকে যায়, তাহলে তা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে।

এ কারণে ২১৩ কোটি টাকার দাবির বৈধতা, কর নির্ধারণের ভিত্তি, ৫০ বছরের বকেয়া আদায়ের সুযোগ এবং নাগরিকের সম্পত্তি নিবন্ধন আটকে দেওয়ার এখতিয়ার—এই চারটি প্রশ্নের দ্রুত প্রশাসনিক ও আইনগত নিষ্পত্তি জরুরি।

চসিক ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ের কাছে বিষয়টি পাঠিয়েছে। এখন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে—সড়কের ওপর দাবিকৃত এই বিপুল কর চসিককে পরিশোধ করতে হবে কি না, অতীতের বকেয়া কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং এর মধ্যে আটকে থাকা নাগরিকদের ভূমি ও ফ্ল্যাট নিবন্ধন সেবা কীভাবে স্বাভাবিক হবে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—দুই সরকারি সংস্থার রাজস্ব বিরোধের দায় কেন বহন করবেন সাধারণ নাগরিক?

চাটগাঁ নিউজ/এসএ

Scroll to Top