নিজস্ব প্রতিবেদক : গ্যাসের সংকট থেকে বিদ্যুৎ সংকট—দুইয়ের চাপে ক্রমেই দুর্বিষহ হয়ে উঠছে বৃহত্তর চট্টগ্রামের জনজীবন। একদিকে প্রয়োজনীয় গ্যাস না পেয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না, অন্যদিকে গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানার উৎপাদনও কমে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঘন ঘন ও দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং। নগরীতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক এলাকায় পানির মোটরও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে গ্যাস ও বিদ্যুতের পাশাপাশি পানির সংকটেও পড়তে হচ্ছে নগরবাসীকে।
চট্টগ্রামের ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ছয়টিতে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। আরও সাতটি কেন্দ্রে উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু থাকার পরও বাস্তবে বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে চট্টগ্রামে ১০০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত সরবরাহ ঘাটতির কথাও উঠে এসেছে।
কাগজে লোডশেডিং নেই, বাস্তবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রামে বিদ্যুতের চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের বড় কোনো ঘাটতি নেই। পিক আওয়ারে চাহিদা প্রায় ১ হাজার ৬৮ মেগাওয়াট এবং অফ-পিক সময়ে প্রায় ৯৫৯ মেগাওয়াট। কাগজে-কলমে সরবরাহও প্রায় সমপরিমাণ দেখানো হচ্ছে। কিন্তু মাঠের চিত্র ভিন্ন। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। কোথাও কয়েক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে, কোথাও দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ থাকছে না। আগস্টের শুরুতেই চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় দিনে সাত-আট ঘণ্টা পর্যন্ত এবং গ্রামাঞ্চলে ১০ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিংয়ের অভিযোগ পাওয়া যায়।
পাথরঘাটা, আসকারদিঘির পাড়, আলকরণ, ওয়াসা, লালখান বাজার, হালিশহর, কালুরঘাট, বায়েজিদ বোস্তামীসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিযোগ করছেন গ্রাহকেরা। শিল্পাঞ্চলেও এর প্রভাব পড়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দ্বৈত সংকটে অনেক কারখানায় উৎপাদন কমে গেছে।
ছয় বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ
জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায়। বন্ধ হয়ে যাওয়া কেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে হাটহাজারী বিদ্যুৎকেন্দ্র, কাপ্তাই সোলার ৭ দশমিক ৪ মেগাওয়াট, রাউজান-১ ও রাউজান-২-এর দুটি ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্র, টেকনাফ সোলার ২০ মেগাওয়াট এবং ইউনাইটেড পাওয়ার ৫০ মেগাওয়াট।
এ ছাড়া আনলিমা এনার্জি, আনোয়ারা ইউনাইটেড, বারাকা, বারাকা কর্ণফুলী, জুলদা-১, জুলদা-২ ও জুডিয়াকসহ সাতটি কেন্দ্রে উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় অনেক কমে এসেছে। ফলে কেন্দ্রগুলোর নামমাত্র সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে সেই সক্ষমতার বড় অংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
মহেশখালীতে এলএনজি আছে, কিন্তু সংকট কাটেনি
চট্টগ্রামের বর্তমান জ্বালানি সংকটের অন্যতম বড় কারণ এলএনজি সরবরাহে অস্থিরতা। মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে স্বাভাবিক সময়ে প্রায় ১১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে সেই পরিমাণ সরবরাহ করা যাচ্ছে না।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এলএনজি কার্গো সংকটের কারণে সরবরাহ একপর্যায়ে ব্যাপকভাবে কমে যায়। পরে নতুন কার্গো আসায় এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল আবার চালু হয়েছে। ২২ আগস্ট রাত থেকে দুই টার্মিনাল মিলে প্রায় ৭৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। অর্থাৎ সরবরাহ বাড়লেও তা এখনো স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আগে মহেশখালীতে মাসে গড়ে প্রায় ১০টি এলএনজি কার্গো আসত। বর্তমানে তা কমে পাঁচ-ছয়টিতে নেমে এসেছে। ফলে টার্মিনাল থাকলেও পর্যাপ্ত কার্গো না থাকায় পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের পর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়। পরে ১৫ আগস্ট টার্মিনালটির কার্যক্রম স্বাভাবিক হলেও পর্যাপ্ত নতুন কার্গো না আসায় পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়নি।
চট্টগ্রামে চাহিদার তুলনায় অর্ধেকের কাছাকাছি গ্যাস
চট্টগ্রামে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। সংকটের তীব্র সময়ে সরবরাহ নেমে আসে এর চেয়ে অনেক নিচে। আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে চট্টগ্রামে দৈনিক চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেকেরও কম গ্যাস সরবরাহের খবর পাওয়া যায়। এর প্রভাব পড়ে বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশন এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে। বিশেষ করে বায়েজিদ, কালুরঘাট ও ফৌজদারহাট শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন কমিয়ে দিতে হচ্ছে। কোথাও বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালানোর চেষ্টা চলছে, কিন্তু এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেশের ইস্পাত খাতের প্রায় ৪০ শতাংশ রি-রোলিং মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে।
সাড়ে পাঁচ মাস ধরে বন্ধ সিইউএফএল
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় শিকারগুলোর একটি চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড—সিইউএফএল। আনোয়ারায় অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত এ সার কারখানায় সর্বশেষ ৩ মার্চ উৎপাদন হয়েছে। পরদিন ৪ মার্চ থেকে গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ২১ আগস্ট পর্যন্ত টানা সাড়ে পাঁচ মাস কারখানাটি বন্ধ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
কারখানাটি চালু রাখতে দৈনিক প্রায় ৪৫ এমএমসিএফডি গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু প্রয়োজনীয় চাপ ও পরিমাণে গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় কারখানাটি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। দৈনিক উৎপাদন বন্ধের পাশাপাশি যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকায় রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ও ক্ষতির ঝুঁকিও বাড়ছে।
সিইউএফএল সূত্রে জানা গেছে, কারখানাটি বন্ধ থাকায় প্রতি মাসে পরিচালন ব্যয় হিসেবে প্রায় ১০ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। ফলে উৎপাদন না থাকলেও প্রতিষ্ঠানের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে কারখানাটির এক হাজারের বেশি শ্রমিক-কর্মচারীর জীবিকা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। চলতি মাসের শেষদিকে গ্যাস সরবরাহ পাওয়ার আশা করা হলেও এখন পর্যন্ত উৎপাদন পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
শুধু বিদ্যুৎ নয়, সার উৎপাদনেও ধাক্কা
গ্যাস সংকটের প্রভাব চট্টগ্রামের সার শিল্পেও বিস্তৃত হয়েছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে চট্টগ্রামের চারটি সার কারখানার মধ্যে তিনটির উৎপাদন স্বাভাবিক নয় বলে জানানো হয়েছে। সিইউএফএল দীর্ঘদিন গ্যাস সংকটে বন্ধ থাকার পাশাপাশি ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানির উৎপাদনও কাঁচামাল সংকটে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে কৃষি মৌসুমে সারের সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী সংকট হলে আমন মৌসুমে সার সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
ব্যবসা-বাণিজ্যেও বাড়ছে চাপ
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন কমে যাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়ছে। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মহল ইতোমধ্যে সংকট মোকাবিলায় সরকারের কাছে বিভিন্ন দাবি জানিয়েছে। চিটাগাং চেম্বার গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্নের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে তিন মাস অতিরিক্ত সময় এবং ব্যাংক সুদ মওকুফের দাবি জানিয়েছে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, গ্যাস না থাকায় একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন প্রক্রিয়া আরও ব্যাহত হচ্ছে। জেনারেটর চালিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের অতিরিক্ত ব্যয়ে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
পানি সংকটেও পড়ছেন নগরবাসী
চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সঙ্গে পানির সংকটও সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকলে বাসাবাড়ির পানির মোটর চালানো যাচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অনেক এলাকায় পানির সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
সর্বশেষ ২৪ আগস্ট বোয়ালখালীতে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে দীর্ঘ সময় পানির মোটর চালানো না যাওয়ায় বাসাবাড়িতে পানির সংকট দেখা দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।
সংকট কি শিগগির কাটবে?
আগস্টের শুরুতে জ্বালানি মন্ত্রী বলেছিলেন, এফএসআরইউ কার্যক্রম পুনরায় চালু হওয়ায় দুই-তিন দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে কয়েক সপ্তাহ পরও চট্টগ্রামে সংকট পুরোপুরি কাটেনি।
সর্বশেষ পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও সরবরাহ এখনো চাহিদার তুলনায় কম। মহেশখালীর দুই টার্মিনাল থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ শুরু না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামের শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক খাতে পুরোপুরি স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফেরার সম্ভাবনা কম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন এলএনজি কার্গো নিয়মিত আসা এবং সরবরাহ স্থিতিশীল হওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।
জ্বালানি নিরাপত্তার বড় প্রশ্ন
চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু সাময়িক গ্যাস বা বিদ্যুৎ সংকটের চিত্র নয়; এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। এলএনজি আমদানিনির্ভরতা, কার্গো সরবরাহে অনিশ্চয়তা, দেশীয় গ্যাসের সীমিত উৎপাদন এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জ্বালানি নির্ভরতার কারণে একটি খাতে সমস্যা তৈরি হলেই তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে অন্য খাতেও।
গ্যাস না থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমছে, বিদ্যুৎ না থাকায় শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, শিল্প উৎপাদন কমায় ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। একই সঙ্গে বাসাবাড়িতে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাও কঠিন হয়ে উঠছে।
চট্টগ্রামের বর্তমান বাস্তবতা তাই স্পষ্ট—সংকট শুধু গ্যাসের নয়, সংকট এখন বিদ্যুৎ, শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনজীবনের সমন্বিত সংকট। দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে এর অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।
চাটগাঁ নিউজ/এসএ





