রাজস্থলী প্রতিনিধি: চারদিকে পাহাড় আর ঘন অরণ্য। নেই সহজ যোগাযোগব্যবস্থা, নেই বিদ্যুতের আলো। কাপ্তাই জেটিঘাট থেকে নৌপথে প্রায় দুই ঘণ্টা কাপ্তাই লেক পাড়ি দেওয়ার পর আরও প্রায় দুই ঘণ্টা দুর্গম পাহাড়ি পথ হেঁটে পৌঁছাতে হয় শুভধন পাড়ায়।
এমন প্রত্যন্ত জনপদে স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও গড়ে ওঠেনি কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তবে শিক্ষার আলো থেকে শিশুদের দূরে রাখতে চাননি স্থানীয়রা। নিজেদের উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন একটি ছোট্ট বিদ্যালয়, যেখানে এখন পড়াশোনা করছে প্রায় ৭০ শিশু।
রাঙামাটি জেলার কাপ্তাই, বিলাইছড়ি ও রাজস্থলী উপজেলার সীমান্তঘেঁষা কাপ্তাই উপজেলার ৪ নম্বর কাপ্তাই ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ১৩০ নম্বর বারুদগোলা মৌজায় শুভধন পাড়ার অবস্থান। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, দারিদ্র্য ও দীর্ঘ পথের কারণে এ এলাকার শিশুদের জন্য নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়া ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কাছাকাছি কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় অনেক শিশুর শিক্ষাজীবন শুরু করাই কঠিন হয়ে পড়েছিল।
এ পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের উদ্যোগে ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘শুভধন পাড়া সংঘরাজ শীলালংকার মহাথের বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ধীরে ধীরে বিদ্যালয়টি পাড়ার শিশুদের শিক্ষার প্রধান আশ্রয় হয়ে উঠেছে। বর্তমানে এখানে প্রায় ৭০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। স্থানীয়দের আশা, আশপাশের সব শিশুকে বিদ্যালয়ের আওতায় আনা গেলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে যাবে।
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা ভদন্ত বুদ্ধজ্যোতি ভিক্ষু (ভাগ্যজিৎ তঞ্চঙ্গ্যা)। বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনায় তাঁর সঙ্গে সহযোগিতা করছেন কানাডাপ্রবাসী প্রজ্ঞাশ্রী ভিক্ষু, শ্রীলঙ্কাপ্রবাসী বিপসসি ভান্তে, কলেজ শিক্ষক অমর বিকাশসহ আরও কয়েকজন শিক্ষানুরাগী।
ভদন্ত বুদ্ধজ্যোতি ভিক্ষু বলেন, দুর্গম এলাকার শিশুরা যেন শুধু যোগাযোগের সমস্যার কারণে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই লক্ষ্যেই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও শিশুরা প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসছে। এলাকার প্রতিটি শিশুকে শিক্ষার সুযোগের মধ্যে নিয়ে আসাই তাঁদের মূল লক্ষ্য।
স্থানীয় কারবারি দীন মোহন তঞ্চঙ্গ্যা জানান, আগে শিশুদের দূরের স্কুলে পাঠাতে গিয়ে অভিভাবকদের নানা সমস্যায় পড়তে হতো। দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে প্রতিদিন সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানো অনেক পরিবারের পক্ষেই সম্ভব ছিল না। এখন পাড়ার কাছেই স্কুল হওয়ায় শিশুরা নিয়মিত পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে।
তবে বিদ্যালয়টি চলছে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে। শিক্ষকরা কোনো বেতন ছাড়াই স্বেচ্ছাশ্রমে পাঠদান করছেন। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও নেওয়া হয় না কোনো ফি। পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, বেঞ্চ-ডেস্ক, শিক্ষা উপকরণসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। এর ওপর পুরো পাড়ায় বিদ্যুৎ না থাকায় সন্ধ্যার পর শিশুদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে।
সহকারী শিক্ষক সাগরিকা তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো বেতন নেওয়া হয় না। শিক্ষকরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন এভাবে বিদ্যালয় পরিচালনা করা কঠিন। বিদ্যালয়ের জন্য সরকারি সহযোগিতা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং শিক্ষকদের জন্য একটি স্থায়ী ব্যবস্থা দরকার।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জোনাকি তঞ্চঙ্গ্যা ও সুশান্ত চাকমারও একই প্রত্যাশা—তাঁদের বিদ্যালয়টি সরকারি হলে শিক্ষার্থীরা আরও ভালো সুযোগ-সুবিধা পাবে এবং পড়াশোনার পরিবেশ উন্নত হবে।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত বিদ্যালয়টিকে সরকারি স্বীকৃতি দিয়ে জাতীয়করণের আওতায় আনা হোক। তাঁদের মতে, সরকারি সহায়তা পাওয়া গেলে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ এবং শিক্ষক নিয়োগ সম্ভব হবে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন বিনা পারিশ্রমিকে দায়িত্ব পালন করা শিক্ষকদেরও আর্থিক নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে।
৪ নম্বর কাপ্তাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী আবদুল লতিফ বলেন, বিদ্যালয়টি সরকারি স্বীকৃতি পাওয়াটা খুবই প্রয়োজন। দুর্গম এলাকার দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়টির পাশে সরকারি সহযোগিতা থাকা জরুরি।
কাপ্তাই উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের জন্য সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কিছু কাগজপত্র পাঠানো হয়েছিল। সেগুলো রাঙামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠানো হয়। তবে প্রয়োজনীয় কিছু কাগজপত্রের ঘাটতি থাকায় আবেদনটি ফেরত এসেছে। নির্ধারিত শর্ত বা ক্রাইটেরিয়া পূরণ করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে পুনরায় আবেদন করতে হবে।
চাটগাঁ নিউজ/মিন্টু/এমকেএন





