হাটহাজারীতে অনুমোদনের আগেই ২৮ লাখ টাকার ব্যাডমিন্টন কোর্ট!
প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন

হাটহাজারী প্রতিনিধি : চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলা পরিষদ চত্বরে প্রায় ২৮ লাখ টাকার একটি ব্যাডমিন্টন কোর্ট নির্মাণকে ঘিরে প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনিক অনুমোদন, অর্থ বরাদ্দ এবং সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শেষ করা হয়েছে। পরে কাজটির প্রশাসনিক বৈধতা নিশ্চিত করতে প্রাক্কলন ও কারিগরি প্রতিবেদন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

প্রতিবেদকের হাতে আসা একটি কারিগরি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলা পরিষদ চত্বরে ব্যাডমিন্টন কোর্ট নির্মাণের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮ লাখ ৩৬ হাজার ৫৫৫ টাকা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উপজেলা পরিষদের মাসিক সভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে প্রাক্কলন প্রস্তুত করে অনুমোদনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, বাস্তবে নির্মাণকাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুতের মাধ্যমে প্রকল্পটির প্রশাসনিক অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে। যদিও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি।

নির্মাণকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) অনুরোধে তিনি দ্রুত কাজটি সম্পন্ন করেন। তার ভাষ্য, জাতীয় নির্বাচনের আগে দ্রুত কাজ শেষ করতে বলা হয়েছিল। সরকারি বরাদ্দ এলে বিল পরিশোধ করা হবে—এই আশ্বাসেই কাজ করেছি। ইতোমধ্যে নিজের প্রায় ২২ লাখ টাকার বেশি ব্যয় করেছি। এখনও কোনো বিল পাইনি। আরও কিছু কাজ বাকি রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মুমিন বলেন, ‘আমরা কোনো না কোনোভাবে টাকাটা ম্যানেজ করব—এই চিন্তা থেকেই একজন ঠিকাদারকে দিয়ে আগে কাজটি করিয়ে নিয়েছি। তিনি প্রায় ২২ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন। জেলা পরিষদ থেকে কোনো বরাদ্দ পাওয়া গেলে তা দিয়ে খরচ সমন্বয় করা হবে।’

তবে কাজ শুরুর আগে প্রশাসনিক অনুমোদন, অর্থ বরাদ্দ এবং সরকারি টেন্ডার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি নির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি।

এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা পরিষদে আগে থেকেই একটি ব্যাডমিন্টন কোর্ট থাকলেও নতুন কোর্ট নির্মাণের সময় চারপাশ টিন দিয়ে ঘিরে দেওয়ায় পাশের সরকারি আবাসিক ভবনগুলোতে আলো-বাতাস চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে সেখানে বসবাসকারী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা ভোগান্তিতে পড়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি আবাসিক ভবনগুলোর সংস্কারের প্রয়োজন থাকলেও সে বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অথচ তুলনামূলক কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত একটি প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, কোর্টটি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত নয়; মূলত প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্যই এটি নির্মাণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রকল্পটির পূর্বানুমোদন ও নির্ধারিত বাজেট না থাকায় বর্তমানে অর্থ ছাড় ও বিল পরিশোধে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।

এ ঘটনায় স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা প্রশ্ন তুলেছেন, বর্ষা মৌসুমে উপজেলার বিভিন্ন সড়ক, কালভার্ট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার বেহাল অবস্থা এবং সরকারি আবাসন সংস্কারের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও একটি ব্যাডমিন্টন কোর্ট নির্মাণে এত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা কতটুকু।

তাদের মতে, সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট জরুরি উন্নয়ন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে প্রকল্পটির অনুমোদন, অর্থ বরাদ্দ, সরকারি ক্রয়বিধি এবং টেন্ডার প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, প্রতিবেদকের হাতে আসা কারিগরি প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রকল্পটির প্রাক্কলন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া এখনও চলমান। অন্যদিকে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার দাবি এবং ইউএনওর বক্তব্য—দুটি বিষয়ই প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো বিধিবহির্ভূত কার্যক্রম হয়েছে কি না, তা কেবল নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।

চাটগাঁ নিউজ/শোয়াইব/এসএ

Scroll to Top