নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রাম নগরের একাধিক বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বছরের পর বছর ধরে অনুমোদিত নকশা ও নিরাপত্তা বিধিমালা লঙ্ঘন করে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। আবাসিক ভবনকে হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার, অনুমোদিত নকশার বাইরে স্থাপনা নির্মাণ, পার্কিং দখল, খোলা জায়গা গ্রাস এবং অগ্নিনিরাপত্তার মারাত্মক ঘাটতির মতো একের পর এক অনিয়ম এবার সরেজমিনে উদ্ঘাটন করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)।
সবচেয়ে গুরুতর অনিয়ম পাওয়া গেছে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও এপিক হেলথকেয়ারে। জননিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলা এসব অনিয়ম দূর করতে প্রতিষ্ঠান দুটিকে এক মাসের চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে সিডিএ। অন্যথায় কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের টিম নগরের মেহেদিবাগ ও পাঁচলাইশ এলাকার ন্যাশনাল হাসপাতাল, ম্যাক্স হাসপাতাল, এরিস্ট্রোকেয়ার হাসপাতাল, এপিক হেলথকেয়ারের তিনটি শাখা এবং পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আকস্মিক পরিদর্শন চালায়। কয়েক ঘণ্টার এই অভিযানে বেরিয়ে আসে একের পর এক বিস্ময়কর অনিয়ম।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যায় এপিক হেলথকেয়ারে। পরিদর্শনে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন ভবন আবাসিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, অনুমোদিত নকশার বাইরে লিফট নির্মাণ, পার্কিং এলাকায় দোকান ভাড়া দেওয়া, বাধ্যতামূলক ড্রাইভওয়ে না রাখা এবং অগ্নি প্রতিরোধ ব্যবস্থায় গুরুতর ঘাটতি পাওয়া যায়। এসব অনিয়মের প্রেক্ষিতে এপিক হেলথকেয়ারের এক্সটেনশন ভবনের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয় সিডিএ।
পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও পাওয়া যায় গুরুতর বিধিলঙ্ঘনের প্রমাণ। আবাসিক-কাম-বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন থাকলেও নকশায় নির্ধারিত ৪০ ফুট খোলা জায়গা পুরোপুরি দখল করে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সংযুক্ত আরেকটি ভবনের কোনো অনুমোদিত নকশাই দেখাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এতে ভবনটির বৈধতা এবং নির্মাণ প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
ন্যাশনাল হাসপাতালের চিত্রও ছিল উদ্বেগজনক। অনুমোদিত নকশায় ৫০টি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে পাওয়া গেছে মাত্র ২৮টি। বাকি জায়গা দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে ওয়াশিং প্ল্যান্টসহ বিভিন্ন স্থাপনা। একই সঙ্গে হাসপাতালের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত এবং জরুরি ফায়ার সিঁড়ি ব্যবহারের অনুপযোগী অবস্থায় রয়েছে বলে পরিদর্শনে উঠে আসে।
ম্যাক্স হাসপাতালেও রোগীদের জন্য নির্ধারিত পার্কিং চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত গাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা দিয়ে দখল করে রাখার প্রমাণ পাওয়া যায়। এ সময় পার্কিং এলাকা দ্রুত অবমুক্ত করা এবং সড়কের প্রতিবন্ধক অংশ অপসারণের নির্দেশ দেয় সিডিএ।
নবনির্মিত এরিস্ট্রোকেয়ার হাসপাতালও নিয়মের বাইরে পরিচালিত হচ্ছে বলে পরিদর্শনে উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি আবাসিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে নির্মিত হলেও হাসপাতাল পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র নেয়নি। এছাড়া অনুমোদিত নকশা থেকে বিচ্যুতি এবং প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল পার্কিংয়ের বিষয়টিও চিহ্নিত করা হয়েছে।
পরিদর্শন শেষে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কর্তৃপক্ষকে আগামী সোমবার অনুমোদিত নকশা, ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে সিডিএ কার্যালয়ে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘হাসপাতাল এমন একটি স্থাপনা যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। তাই অনুমোদিত নকশা, পর্যাপ্ত পার্কিং, কার্যকর অগ্নিনিরাপত্তা এবং সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। জনস্বার্থে প্রতিষ্ঠানগুলোকে এক মাস সময় দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সিডিএর এই অভিযানকে নগরের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়মের বিরুদ্ধে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। জননিরাপত্তা ও সুশৃঙ্খল নগর ব্যবস্থাপনার প্রশ্নে এবার অনিয়মকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে বাস্তবিক ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না, সেদিকেই নজর সবার।
চাটগাঁ নিউজ/এসএ





