বিমানবন্দরে গিয়ে দেখছে ভিসা বাতিল—আতঙ্কে আমিরাত প্রবাসীরা, সরকার নীরব!

সরোজ আহমেদ : মেয়ের বিয়ের জন্য প্রায় এক মাস আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দেশে ফিরেছিলেন চট্টগ্রামের প্রবাসী মো. খোরশেদ আলম। দীর্ঘদিনের কষ্টার্জিত অর্থে তড়িঘড়ি করে সম্পন্ন করেন বিয়ের সব আয়োজন। পরিকল্পনা ছিল, বিয়ে শেষ করেই কর্মস্থল আমিরাতে ফিরে যাবেন। কিন্তু বিয়ের অনুষ্ঠান চলাকালীনই আসে জীবনের সবচেয়ে দুঃসহ সংবাদ। জানতে পারেন, তাঁর কর্মভিসা বাতিল হয়ে গেছে। মুহূর্তেই উৎসবের পরিবেশ বিষাদে ছেয়ে যায়। স্বজনদের আনন্দ বদলে যায় উদ্বেগে। নিজের ভবিষ্যৎ, পরিবারের জীবিকা এবং বিদেশে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন—সবকিছু নিয়েই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে যান তিনি।

খোরশেদ আলমের মতো একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন দেশে ছুটিতে আসা শত শত প্রবাসী। কেউ পরিবারের সঙ্গে ঈদ বা ছুটি কাটাতে, কেউ বাবা-মায়ের চিকিৎসা কিংবা সন্তানের বিয়ে উপলক্ষে দেশে এসেছেন। কিন্তু কেউ বিমানবন্দরে গিয়ে, কেউ বা বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পারছেন তাঁদের কর্মভিসা বাতিল হয়ে গেছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে ফেরা নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। তবে এ ব্যাপারে আরব আমিরাত থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি!

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বহু বাংলাদেশি প্রবাসীর ভিসা বাতিলের ঘটনা সামনে আসছে। অনেকেই দেশে অবস্থান করায় সময়মতো বিষয়টি জানতে পারেননি। কেউ কেউ বিমান টিকিট কেটে প্রস্তুতি নেওয়ার পর জানতে পারছেন, তাঁদের ভিসা আর কার্যকর নেই। এতে একদিকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে নতুন করে কর্মসংস্থান নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

প্রবাসীদের অভিযোগ, ভিসা বাতিলের বিষয়ে অনেক ক্ষেত্রে আগে থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেওয়া হচ্ছে না। ফলে দেশে থাকা অবস্থায় হঠাৎ এ খবর পেয়ে তাঁরা দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। অনেকেই ঋণ নিয়ে বিদেশে গেছেন। কারও সন্তানদের পড়াশোনা, কারও পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস বিদেশের চাকরি। ভিসা বাতিল হওয়ায় পুরো পরিবারই এখন আর্থিক সংকটের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ ও প্রবাসী কল্যাণসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান অপরিসীম। প্রতি বছর তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে এবং অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই ব্যাপক হারে প্রবাসীদের কর্মভিসা বাতিল হলে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার নয়, জাতীয় অর্থনীতিও এর বিরূপ প্রভাব থেকে রেহাই পাবে না।

তাঁরা বলছেন, বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি প্রবাসী শ্রমবাজারের স্থিতিশীলতা এবং দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই কেন এ ধরনের ভিসা বাতিল হচ্ছে, কতজন বাংলাদেশি এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং তাঁদের পুনরায় কর্মস্থলে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ আছে কি না—এসব বিষয়ে দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

এদিকে, আজ শুক্রবার (২৪ জুলাই) প্রবাসীদের ভিসা বাতিলের খবরে সরকারের এমপি, মন্ত্রী ও সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সিপ্লাসটিভি ও চাটগাঁ নিউজের এডিটর ইন চীফ আলমগীর অপু তাঁর ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাস্টাস দিয়েছেন। স্ট্যাস্টাসে তিনি লেখেন- চট্টগ্রামের সমস্ত এমপি মন্ত্রীদের অনুরোধ করছি আপনারা দলবেঁধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে দেখা করে আরব আমিরাতের সাথে কথা বলতে বলেন। অথবা সফর করতে বলেন। আমিরাত প্রবাসীদের মধ‍্যে এক ধরণের আতংক শুরু হয়েছে। অটো ভিসা ক‍্যানসেল হচ্ছে অহরহ। সকাল থেকে ফোন মেসেজ কি পরিমান পেয়েছি অবিশ্বাস্য । এতো ফোনকল রিসিভ করতে পারছি না। বিভিন্ন জায়গায় কথা বলেছি। শুধু জেনে রাখুন, সংসদের স্পীকার আর দলবল ইরানে গেলে হবে না! ইরান আমাদের জন‍্য কোন হিসাবের বিষয় নয়। আবেগ দিয়ে কিছু হয় না। বাস্তবতা মানতে হবে। ছোট করে ইঙ্গিত দিলাম। ভয়াবহ হবে বিষয়টা। যে দেশ আমাদের মিলিয়ন মানুষের কর্মসংস্থান করেছে তার সাথে, সে দেশের পলিসির সাথে আমাদের একমত হতে হবে। অন‍্যথায় ডিজেস্টারের জন‍্য প্রস্তুত থাকুন।

আলমগীর অপুর এই স্ট্যাস্টাস ব্যাপক মানুষের নজরে আসে। এতে অনেক সংসদ সদস্যসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ কমেন্ট করেন। কয়েকটি কমেন্ট হুবহু তুলে ধরা হলো-

চট্টগ্রাম-১০ (পাহাড়তলী-ডবলমুরিং) সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান বলেন, আমি ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে যোগাযোগ করেছি। সরকার এই বিষয়টি নিয়ে সিরিয়াসলি কাজ করছে, ইনশাআল্লাহ শীঘ্রই ইতিবাচক ফলাফল আসবে বলে আশাবাদী। যদি আমরা ৮০’র দশকের তুলনায় অনেক শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ হয়ে থাকি এখন তাহলে এর পেছনের একটি বড় কারণ হলো আমাদের “প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা” ভাই ও বোনেরা। তাদের স্বার্থ রক্ষা করা আমাদের কাছে কোনো অপশন নয়, বরং জাতীয় দায়িত্ব।

মো. মহিউদ্দিন নামে এক প্রবাসী বলেন, আমি একজন আমিরাত প্রবাসী, আমরা বাংলাদেশ যারা সবাই অনেক সমস্যার মধ্যে আছি, সরকার কে বলেন একটু দ্রুত সময় এ দেশের সাথে যোগাযোগ করে কোন কিছু বেবস্তা গ্রহণ করতে, না হয় অনেক বাংলাদেশি ভাইরা বিপদে পড়বে, আর এখানের বাংলাদেশি এম্বাসি কোন কাজ করছে না, সবাই কে হয়রানি করতেছে।

ইয়াসিন চৌধুরী সুজন নামে একজন বলেন, ১৪/১৫ লাখ প্রবাসী চাকরী, ব্যবসা করেন আরব আমিরাত। সাথে তাদের দেশে থাকা প্রতি পরিবার ৫জন সদস্য ও যদি বাংলাদেশ থাকে তাহলে ৭৫ লক্ষ মানুষ ভাগ্য নির্ভর করছে বর্তমান বাংলাদেশ সরকার উপর। প্রত্যেক মাসে কি পরিমাণ রেমিট্যান্স যাই বাংলাদেশে তা বাংলাদেশ ব্যাংক, মন্ত্রাণালয় ও সরকার ভালো জানেন।

এছাড়া এই ঘটনা নিয়ে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল তাঁর ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দেন। এতে তিনি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসরত আমাদের প্রিয় প্রবাসী ভাই-বোনদের ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতা শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত সংকট নয়—এটি আমাদের সবার উদ্বেগের বিষয়। দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি, আমাদের অক্লান্ত রেমিটেন্স যোদ্ধাদের অবদান জাতি কখনোই ভুলতে পারে না।

মন্ত্রী আরও বলেন, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকগণ এ বিষয়ে সম্পূর্ণ অবগত রয়েছেন এবং এই সংকটের দ্রুত ও স্থায়ী সমাধানে কূটনৈতিক পর্যায়ে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, প্রবাসীদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষা করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় তাঁদের ত্যাগ, শ্রম ও অবদান অনন্য। তাই তাঁদের যেকোনো সমস্যার সমাধানেও সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।
আল্লাহর অশেষ রহমতে, আমরা আশাবাদী যে খুব শিগগিরই এই জটিলতার ইতিবাচক সমাধান হবে এবং আমাদের প্রবাসী ভাই-বোনেরা আবারও স্বস্তি, সম্মান ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তাঁদের কর্মজীবন অব্যাহত রাখতে পারবেন।

চাটগাঁ নিউজ/এসএ

Scroll to Top