রাতের আঁধারে হাটহাজারী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্ক্র্যাপ বিক্রিতে ধরা!

হাটহাজারী প্রতিনিধি: চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পুরোনো দরজা-জানালা, চেয়ার, লোহার রডসহ বিভিন্ন পরিত্যক্ত স্ক্র্যাপ মালামাল সরকারি বিধি না মেনে রাতের আঁধারে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

শুক্রবার (৮ আগস্ট) রাত ১০টার দিকে ভ্যানভর্তি এসব স্ক্র্যাপ হাসপাতাল থেকে বের করে নেওয়ার সময় স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিকের হাতে ধরা পড়ে।

এ সময় ভ্যানচালক ও কয়েকজন শ্রমিককে আটক করা হলেও হাসপাতালের সুইপার পদে কর্মরত বলরাম পালিয়ে যান।

স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ভ্যানভর্তি পুরোনো দরজা-জানালা, চেয়ারসহ বিভিন্ন মালামাল দেখতে পান। পরে স্ক্র্যাপসহ ভ্যানটি আটক করা হয়। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে সুইপার বলরাম দ্রুত হাসপাতালের একটি কুকার রুমে ঢুকে পড়েন। সাংবাদিকরা সেখানে যেতে চাইলে তিনি ভেতর থেকে দরজায় তালা লাগিয়ে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

হাসপাতাল সূত্র ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সম্প্রতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দোতলাসহ কয়েকটি কক্ষের মেরামতকাজ করা হয়। মেরামতের পর পুরোনো দরজা-জানালা, লোহার রডসহ বিভিন্ন মালামাল পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। সরকারি বিধি অনুযায়ী, এসব মালামাল পরিত্যক্ত ঘোষণা, কমিটি গঠন এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে নিলাম বা ডিসপোজালের মাধ্যমে বিক্রি করার কথা।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ না করে বুধবার থেকে ভ্যানযোগে পুরোনো মালামাল হাসপাতাল থেকে বের করে স্থানীয় একটি ভাঙারি দোকানে বিক্রি করা হচ্ছিল। বুধ ও বৃহস্পতিবার কোনো বাধা ছাড়াই মালামাল বের করে নেওয়া হলেও বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যে জানাজানি হওয়ার পর শুক্রবার রাতে মালামাল নিয়ে যাওয়ার সময় তা ধরা পড়ে।

ঘটনাস্থলে জিজ্ঞাসাবাদে ভাঙারি ব্যবসায়ী জানান, তিনি মালামালগুলো প্রতি মণ ১০০ টাকা দরে কিনেছেন। তবে এ বিষয়ে কোনো টেন্ডার বা লিখিত কাগজপত্র করা হয়নি বলেও তিনি জানান।

এ বিষয়ে শুক্রবার রাতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. সোহানিয়া আক্তার বিল্লাহর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তাকে জানিয়েছেন, নিয়ম মেনেই মালামাল বিক্রি করা হয়েছে। তবে সাংবাদিকদের উপস্থিতি দেখে সুইপার বলরামের পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান তিনি।

শনিবার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তাপস কান্তি মজুমদার বলেন, সরকারি আইন অনুযায়ী মালামালগুলো পরিত্যক্ত ঘোষণা করে বিক্রি করা হয়েছে। এ জন্য ইউএনও অথবা তাঁর প্রতিনিধিসহ একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে কমিটি গঠনের পর মালামাল বিক্রির সময় তিনি বা তাঁর কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না কেন—এ বিষয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে ব্যস্ততার কারণে তিনি কিংবা তাঁর কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত থাকতে পারেননি।

এ সময় হাসপাতালের অফিস সহকারী শৈবাল সেন চলতি মাসের ৩ তারিখে ইউএনও বরাবর করা একটি আবেদনের কপি দেখান। তবে ওই আবেদনে ইউএনও কার্যালয়ের গ্রহণের কোনো স্বাক্ষর বা সিল ছিল না।

মালামাল হাসপাতাল থেকে কার মাধ্যমে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ওই ব্যক্তির নাম না জানিয়ে শুধু তাঁর উপস্থিতি নিশ্চিত করেন। রাতের আঁধারে মালামাল পরিবহন এবং সুইপার বলরামের উপস্থিতি ও পরে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান তিনি।

এদিকে, ইউএনও বরাবর করা আবেদনের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের কার্যালয়ের ডেস্ক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবুল খায়েরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা এ ধরনের কোনো আবেদন পাওয়ার কথা অস্বীকার করেন।

হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, হাসপাতালের মালামাল বিক্রির বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। সরকারি বিধি অনুসরণ না করে এভাবে মালামাল বিক্রি করার সুযোগ নেই। বিষয়টি তিনি অবশ্যই খতিয়ে দেখবেন।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ ফজলে রাব্বির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, হাসপাতালের পরিত্যক্ত মালামাল বিধিমতে নিলামের মাধ্যমে বিক্রির নির্দেশনা তিনি দিয়ে এসেছিলেন। এরপরও কেন এভাবে মালামাল বিক্রি করা হয়েছে, বিষয়টি তিনি দেখবেন।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালেও হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে একইভাবে কিছু অকেজো মালামাল বিক্রির অভিযোগ উঠেছিল। এ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর বিক্রি করা মালামাল ফেরত নিয়েছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ওই ঘটনাতেও হাসপাতালের সুইপার পদে কর্মরত বলরামের প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছিল বলে জানা গেছে।

চাটগাঁ নিউজ/শোয়াইব/এমকেএন

Scroll to Top