রাঙ্গুনিয়া এখন পাহাড়ি হলুদের বৃহৎ বাজার

জগলুল হুদা: ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তিন পার্বত্য জেলার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া এখন পাহাড়ি কৃষিপণ্যের অন্যতম প্রধান বিপণন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে উৎপাদিত উৎকৃষ্ট মানের হলুদ, আদা ও ফুলঝাড়ুসহ বিভিন্ন পণ্য এখন রাঙ্গুনিয়া হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। বিশেষ করে হলুদের মৌসুমে রাঙ্গুনিয়ার ইছাখালী এলাকায় চোখে পড়ে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ।

সরেজমিনে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা সদরের ইছাখালী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ব্যবসায়ীদের দম ফেলার ফুরসত নেই। পাহাড় থেকে আসা কাঁচা হলুদ রোদে শুকানো, বাছাই ও বস্তাবন্দির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন শত শত শ্রমিক। প্রতিটি স্পটে ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। হলুদ শুকানোর এই সোনালি দৃশ্য স্থানীয়দের নজর কাড়ছে।

জানা যায়, রাঙ্গুনিয়ার নিজস্ব পাহাড়ি এলাকায় হলুদের আবাদ হলেও সিংহভাগ হলুদ আসে সংলগ্ন রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের বিভিন্ন দুর্গম এলাকা থেকে। রাঙ্গুনিয়ার অন্তত অর্ধশত মৌসুমি ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে এই বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। তারা কাপ্তাই, বিলাইছড়ি ও ফারুয়াসহ বিভিন্ন দুর্গম অঞ্চল থেকে হলুদ সংগ্রহ করে ট্রাকে করে ইছাখালীতে নিয়ে আসেন।

প্রবীণ ব্যবসায়ী নুরুল আজিম জানান, তিনি গত ২৭ বছর ধরে এ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তিনি বলেন, পৌষ থেকে বৈশাখ—এই চার মাস হলুদের মূল মৌসুম। আমরা পাহাড় থেকে হলুদ সংগ্রহ করে ইছাখালীতে এনে মজুত করি। এখানে ৪-৫ দিন শুকিয়ে ও বাছাই করে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন আড়তে সরবরাহ করি। এই মৌসুমে একজন ব্যবসায়ী ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করেন।

ব্যবসায়ী মো. আব্বাস জানান, মূলত তিন ধরনের হলুদের চাহিদা বেশি। এর মধ্যে ‘পাবনা’ জাতের হলুদ প্রতি কেজি ১৯৫-২০০ টাকা, ‘শিলং’ ১৭৫-১৮০ টাকা এবং ‘মোড়া’ ১৬৫-১৭০ টাকায় সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহন খরচ বাবদ কেজিপ্রতি আরও ৮-১০ টাকা ব্যয় হয়। এরপর সামান্য লাভে এসব পণ্য ঢাকা, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জসহ বড় পাইকারি বাজারে বিক্রি করা হয়। দেশের নামী মশলা উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোও সরাসরি এখান থেকে হলুদ সংগ্রহ করছে।

শ্রমিক মো. করিম বলেন, আমরা প্রতি বছর এই মৌসুমের অপেক্ষায় থাকি। ব্যবসায়ীদের আড়তে ৩-৪ মাস টানা কাজ থাকে। এতে স্থানীয় অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়।

ব্যবসায়ীদের মতে, তিন পার্বত্য জেলার মাঝামাঝি অবস্থান ও সহজ পরিবহন সুবিধার কারণে রাঙ্গুনিয়া পণ্য মজুতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তবে যথাযথ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা (হিমাগার) গড়ে উঠলে এ ব্যবসা আরও সম্প্রসারিত হয়ে বিদেশেও রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি হবে।

এ বিষয়ে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস বলেন, রাঙ্গুনিয়ায় প্রায় ৭৫ হেক্টর জমিতে হলুদের আবাদ হয়েছে। স্থানীয় কৃষকরা অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি নিজেদের চাহিদা পূরণে এই চাষ করে থাকেন। তবে পার্বত্য এলাকার বিপুল পরিমাণ হলুদ রাঙ্গুনিয়া হয়ে সারাদেশে সরবরাহ হচ্ছে। কৃষকদের সুবিধার্থে রাঙ্গুনিয়ার সাংসদ হুমাম কাদের চৌধুরী হিমাগার নির্মাণের বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছেন এবং কৃষিমন্ত্রীর সঙ্গেও আলোচনা করেছেন। আশা করছি, দ্রুতই এখানে একটি হিমাগার স্থাপন করা হবে।

চাটগাঁ নিউজ/এমকেএন

Scroll to Top