জগলুল হুদা: দুর্ঘটনা দেখে সাহায্যের হাত না বাড়িয়ে চারপাশের অধিকাংশ মানুষ যখন মুঠোফোনে দৃশ্যটি ধারণ করতে ব্যস্ত, তখন এক মুমূর্ষু যুবকের প্রাণ বাঁচাতে মানবিকতার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন সিএনজি অটোরিকশা চালক আবুল হাসান বাদশা এবং স্থানীয় তরুণ মোহাম্মদ নেছারুল হক।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) রাত ১০টার দিকে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার কাটাখালী তক্তারপুল এলাকায় ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার পর এই দুই তরুণের অনন্য দায়িত্ববোধ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসায় ভাসছে।
ঘটনার দিন কাটাখালী এলাকায় লাল-সবুজ পরিবহনের একটি বাসের ধাক্কায় প্রথমে খাদে ছিটকে পড়ে চন্দ্রঘোনা বুইজ্জার দোকান এলাকার একটি সামাজিক অনুষ্ঠানের রান্নার বিরিয়ানির ডেক্সিভর্তি ভ্যান। বাসের ধাক্কায় ডেক্সিসহ চালক ও ভ্যানটি খাদে পড়ে যায় এবং ভ্যানচালক গুরুতর আহত হন। সেই দুর্ঘটনার খবর পেয়ে খোঁজ নিতে দ্রুত ঘটনাস্থলে হাজির হন চন্দ্রঘোনা বুইজ্জার দোকান এলাকার তরুণ নেছারুল হক। কিন্তু সেখানে পৌঁছে তিনি দেখতে পান আরও এক বিভীষিকাময় দৃশ্য।
ভ্যান দুর্ঘটনার ঠিক পেছনেই বাসের নিচে পিষ্ট হয়ে মোটরসাইকেলসহ রক্তে ভেসে যাচ্ছিলেন কাপ্তাই উপজেলার রাইখালী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের লেমুছড়ি পাড়ার ইউপি সদস্য শেখ মোহাম্মদ নাছেরের ছেলে মো. রাসেল (২৩)। চারপাশের উৎসুক জনতা তখন মোবাইলে ভিডিও ধারণে মত্ত, কেউ এগিয়ে আসছেন না। ঠিক সেই মুহূর্তে কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে পাঁচজন যাত্রী নিয়ে আসা সিএনজি অটোরিকশা চালক আবুল হাসান বাদশা দৃশ্যটি দেখে তাৎক্ষণিকভাবে নিজের গাড়ির যাত্রীদের নামিয়ে দেন।
নিজের সিএনজি অটোরিকশাটি চুরি হওয়ার পর মাথার ওপর বিপুল অঙ্কের ঋণের বোঝা নিয়ে চলছিলেন অটোরিকশা চালক বাদশা। কিন্তু সমস্ত আর্থিক ক্ষতি ও দুশ্চিন্তা ভুলে রক্তাক্ত অচেনা যুবক রাসেলকে গাড়িতে তোলেন তিনি। তবে একা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব দেখে এবং পাশে বসার মতো কাউকে না পেয়ে উপস্থিত লোকজনের উদ্দেশ্যে আকুল আকুতি জানাতে থাকেন বাদশা। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তাকে বারবার বলতে শোনা যায়, “ওগ্গো মানুষ অইলেও বইয়োনা, ভাই ওগ্গো মানুষ অইলেও বইয়োনা।” (ভাই, একজন মানুষ হলেও ওর পাশে বসুন, একজন মানুষ হলেও ওর সঙ্গে চলুন।)
ভিড়ের সেই চরম উদাসীনতা ঠেলে সিএনজি চালক বাদশার আকুল আহবানে আশার আলো হয়ে প্রথম এগিয়ে আসেন চন্দ্রঘোনার তরুণ মোহাম্মদ নেছারুল হক ও স্থানীয় এক মুরুব্বি। তারা নিহত রাসেলকে গাড়িতে উঠান। নেছারুল দ্রুত অটোরিকশায় উঠে বসেন এবং চালক বাদশার সাথে এক হয়ে পরিচয়হীন রক্তাক্ত রাসেলকে নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দিকে ছোটেন।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পৌঁছে চিকিৎসকদের চিকিৎসাকাজে সহায়তা করা, অচেনা যুবকের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য চারদিকে খবর পাঠানো এবং স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা— সব জায়গায় একসাথে লড়ে যান বাদশা ও নেছারুল। রাসেলের পরিবারের সদস্যরা পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত এই দুই তরুণই যেন হয়ে উঠেছিলেন তার পরম আপনজন। যদিও তাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে মৃত্যুকেই আলিঙ্গন করেন সেই যুবক।
জানা গেছে, হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসকরা রাসেলকে মৃত ঘোষণা করেন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে ডাক্তাররা নিশ্চিত করেন।
এদিকে আজ শুক্রবার (৭ আগস্ট) বাদে জুম্মা তার নিজ গ্রাম রাইখালীর লেমুছড়ি পাড়ার স্থানীয় মসজিদ মাঠে নিহতের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। তবে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত অচেনা এক যুবকের জীবন বাঁচাতে বাদশা ও নেছারুলের এই সংগ্রাম মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় শিক্ষক কুতুবুল আহসান বলেন, ‘বিপদের মুহূর্তে ভিডিও ধারণ না করে সাহায্য করতে এগিয়ে আসাই আসল মানবিকতা। সিএনজি চালক বাদশা এবং তরুণ নেছারুলের এই নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টাকে প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিকভাবে পুরস্কৃত করা উচিত, যাতে তাদের দেখে অন্যরাও বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়াতে উৎসাহিত হয়।’
ঘটনা সম্পর্কে রাঙ্গুনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জহির উদ্দিন জানান, দুর্ঘটনার পর পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দুর্ঘটনাকবলিত বাস ও মোটরসাইকেল জব্দ করেছে। এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
এছাড়া বাদশা ও নেছারুল যে মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তার প্রশংসাও করেন এই ওসি।
চাটগাঁ নিউজ/জেএইচ





