রাউজান প্রতিনিধি: দ্বাদশ জাতীয় সংসদের মতো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদেও চট্টগ্রামের পৃথক তিনটি আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন রাউজানের তিন সন্তান। তবে এবার রয়েছে ভিন্নতা। আগের সংসদে রাউজান পৌরসভার একই ওয়ার্ড ও একই গ্রামের তিনজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও এবার পৃথক দুই গ্রামের তিনজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে রাউজানবাসীর মধ্যে গর্বের অনুভূতি বিরাজ করছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসন থেকে হুমাম কাদের চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং, হালিশহর ও খুলশী) আসন থেকে সাঈদ আল নোমান। তিনজনই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এ ফলাফল স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
নির্বাচিতদের মধ্যে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও হুমাম কাদের চৌধুরীর গ্রামের বাড়ি রাউজান পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গহিরা গ্রামের বক্স আলী চৌধুরী বাড়ি।
পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের পঞ্চম স্পিকার ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ফজলুল কাদের চৌধুরীর দ্বিতীয় পুত্র হলেন গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র, ছয়বারের সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী-এর দ্বিতীয় ছেলে হলেন হুমাম কাদের চৌধুরী। সে হিসেবে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও হুমাম কাদের চৌধুরী সম্পর্কে চাচা–ভাতিজা।
অপরদিকে সাঈদ আল নোমানের বাড়ি রাউজান উপজেলার ৩ নম্বর চিকদাইর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ সর্তা গ্রামের কালাচাঁদ চৌধুরী বাড়ি। তিনি বিএনপির দুই মেয়াদের সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী এবং খাদ্যমন্ত্রী, চট্টগ্রাম-৯ আসনের দুইবারের সংসদ সদস্য প্রয়াত আবদুল্লাহ আল নোমানের ছেলে।
এর আগে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাউজান পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড থেকে তিনজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তারা হলেন চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি, বাকলিয়া) আসনে মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং, পাহাড়তলী, হালিশহর) আসনে মহিউদ্দীন বাচ্চু। তারা তিনজনই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ছিলেন। তাদের মধ্যে এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী ও মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের গ্রামের বাড়ি গহিরা বক্স আলী চৌধুরী বাড়ি এবং মহিউদ্দীন বাচ্চুর বাড়ি একই ওয়ার্ডের রকিব উদ্দিন মুন্সির বাড়ি। তবে তারা প্রত্যেকেই স্ব স্ব আসনের ভোটার এবং নিজ নিজ আসনে তাদের বসতভিটা রয়েছে।
রাউজান থেকে ধারাবাহিকভাবে একাধিক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল। বিশেষ করে একই উপজেলার সীমার ভেতরে অবস্থিত দুই গ্রাম থেকে পৃথক তিনটি সংসদীয় আসনে প্রতিনিধিত্ব পাওয়া নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা।
রাজনৈতিক দলবদলের প্রেক্ষাপটে আগের সংসদে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত তিন সদস্যের জায়গায় এবার বিএনপি-সমর্থিত তিন সদস্যের নির্বাচন স্থানীয় রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা ও নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ রাউজানের রাজনৈতিক গুরুত্বকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
সব মিলিয়ে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে রাউজানের দুই গ্রামের তিন সন্তানের প্রতিনিধিত্ব স্থানীয়দের কাছে যেমন গর্বের, তেমনি এটি জাতীয় রাজনীতিতেও এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।
রাউজান পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও পৌরসভা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মঞ্জুরুল হক এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, রাউজান দীর্ঘদিন ধরেই দেশের জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। এবার রাউজান পৌরসভা ও একটি ইউনিয়নের পৃথক দুই ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের তিন সন্তান জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন, যা পুরো রাউজানবাসীর জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়।
সৈয়দ মঞ্জুরুল হক আরও উল্লেখ করেন, সুদূর অতীত থেকে রাউজানের কৃতি সন্তানরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিপ্লবী নেতা মাস্টারদা সূর্য সেন, প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ফজলুল কাদের চৌধুরী, শহীদ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ আব্দুল্লাহ আল নোমান এবং এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী অন্যতম।
তিনি বলেন, এসব গুণী ও সংগ্রামী নেতাদের ঐতিহ্য রাউজানকে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। আগামী দিনেও রাউজানের সন্তানরা জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবেন—এমনটাই প্রত্যাশা করেন তিনি।
চাটগাঁ নিউজ/জয়নাল/এমকেএন





