চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক : নিজ এলাকায় হামলার শিকার হওয়ার ছয় মাস পর রাউজানে গেলেন চট্টগ্রাম-৬ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী গোলাম আকবর খোন্দকার। তবে একই আসনে বিএনপি গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীকেও মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি।
রোববার (৪ জানুয়ারি) সদ্যপ্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শোকসভার কর্মসূচিতে যোগ দিতে নিজ এলাকায় যান গোলাম আকবর খোন্দকার।
রাউজান উপজেলার গহিরায় গোলাম আকবর খোন্দকারের বাসভবনের সামনে মাঠে এ শোকসভা ও দোয়া মাহফিল হয়। রাউজান উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপি এ কর্মসূচির আয়োজন করে। এলাকায় গোলাম আকবর খোন্দকারের ফেরা নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যেও প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।
শোকসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে গোলাম আকবর খোন্দকার বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রী নন, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব ও আপসহীন নেতৃত্বের প্রতীক। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার দৃঢ়তা আজও আমাদের প্রেরণা জোগায়। তিনি শুধু বিএনপির নেত্রী নন, তিনি ছিলেন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক অবিসংবাদিত নেতৃত্ব। আপসহীনতা, দেশপ্রেম ও সাহসিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে তিনি ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন।’
তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগত জীবনে সীমাহীন ত্যাগ স্বীকার করেও দেশ ও মানুষের অধিকার থেকে কখনো পিছু হটেননি খালেদা জিয়া। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামে তিনি প্রমাণ করেছেন জনগণের শক্তির কাছে কোনো দমননীতি টিকে থাকতে পারে না। আজকের এই শোকসভা কেবল শোক প্রকাশ নয়, এটি তার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার। খালেদা জিয়ার স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তেই বিএনপি রাজপথে ছিল, আছে এবং থাকবে।’
রাউজান উপজেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক জসীম উদ্দিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত শোকসভায় আরও বক্তব্য দেন ইয়ুথ ভয়েস অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার তারেক আকবর খোন্দকার, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সভাপতি হাসান মাহমুদ জসিম, রাউজান পৌরসভা বিএনপির সভাপতি আবু আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার উদ্দিন খান প্রমুখ।
রাউজানে বিএনপির রাজনীতি দুটি বলয়ে বিভক্ত। এর মধ্যে একটি বলয়ে আছেন গোলাম আকবরের অনুসারীরা। আরেকটি বলয়ে আছেন বিএনপির সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও রাউজানের সাবেক সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারীরা। গিয়াস কাদের একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসি হওয়া সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছোট ভাই। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীও গ্রেফতার হয়ে কারাগারে গিয়েছিলেন। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি দেশ ছেড়ে যান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি দেশে ফেরেন।
এরপর রাউজানে দুই নেতার অনুসারীরা মুখোমুখি হয়ে পড়েন। শুরু হয় আধিপত্যের সংঘাত। রাজনৈতিক অন্তর্দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বকে কেন্দ্র করে রাউজানে গত দেড় বছরে কমপক্ষে ১৮টি খুনের ঘটনা ঘটেছে, এর মধ্যে অন্তত ১২টি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং নিহতরা সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে গোলাম আকবর খোন্দকার গত বছরের ২৯ জুলাই রাউজান পৌরসভা সদরের সুলতানপুরে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ও রাউজান উপজেলার সাবেক সভাপতি প্রয়াত মহিউদ্দিন আহমেদের কবর জেয়ারতের জন্য নেতাকর্মীদের নিয়ে যাচ্ছিলেন। একই সময়ে গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারীরা পৌর সদরে মোটর সাইকেল শোভাযাত্রা বের করে। পৌরসভার ছত্তারহাট এলাকায় উভয় গ্রুপ মুখোমুখি হলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। গোলাম আকবর খোন্দকার হামলায় রক্তাক্ত হন এবং অল্পের জন্য গুলিবিদ্ধ হওয়া থেকে বেঁচে যান।
সংঘাতের পর কেন্দ্র থেকে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। ওই কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছিলেন গোলাম আকবর খোন্দকার। এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াসউদ্দিন চৌধুরীর প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলীয় সকল পদ স্থগিত করা হয়। পরে অবশ্য সদস্যপদ ফিরে পান গিয়াস কাদের।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য রাউজানে বিএনপি প্রথমে দলটির সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তাকে বাদ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা না দিয়ে মনোনয়নের চিঠি দেওয়া হয় চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খোন্দকারকেও। ফলে উভয় প্রার্থীই মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করে দাখিল করেন এবং উভয়ের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্তে নির্বাচনী ট্রেন থেকে কাকে নামিয়ে দেয়া হবে তা দেখার অপেক্ষায় রাউজানবাসী।
চাটগাঁ নিউজ/এসএ







