আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা থামিয়ে শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে— সাময়িক সময়ের জন্য। ওয়াশিংটন সময় মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সন্ধ্যা ৬টা ৩২ মিনিটে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক ঘোষণায় জানান, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘সুনির্দিষ্ট’ শান্তি চুক্তির পথে অনেক দূর এগিয়েছে। আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার স্বার্থে তিনি দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছেন। তবে এই সাময়িক স্বস্তির আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রকে দিতে হয়েছে বড় ধরনের কৌশলগত ও কূটনৈতিক মাশুল।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দেওয়া রাত ৮টার ডেডলাইন (ইরানের অবকাঠামোয় হামলার চূড়ান্ত সময়সীমা) শেষ হওয়ার মাত্র দেড় ঘণ্টা আগে এই ঘোষণাটি আসে। তেলের বাজার এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়লেও, বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির ফলে দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ও আঞ্চলিক আধিপত্য সংকটের মুখে পড়েছে।
চুক্তির শর্ত ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
যুদ্ধবিরতির প্রাথমিক শর্ত হিসেবে ইরান তাদের বৈরিতা বন্ধ করতে এবং হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দিতে রাজি হয়েছে। তবে তারা স্পষ্ট করে দিয়েছে, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর তাদের ‘কর্তৃত্ব’ বজায় থাকবে। এর অর্থ হলো, এখন থেকে এই পথে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে হবে, যা ওই অঞ্চলে ইরানের সামরিক আধিপত্যকে আরও বেশি বৈধতা দিচ্ছে।
বিশ্বের চোখে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন
একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন বিস্ময়কর হুমকি ইরানকে আগে প্রত্যাখ্যান করা যুদ্ধবিরতিতে রাজি হতে বাধ্য করেছে কি না, তা অনিশ্চিত। তবে এটি পরিষ্কার, ট্রাম্পের এই স্তম্ভিত করার মতো উসকানিমূলক ঘোষণা আধুনিক কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের দেওয়া অন্য যেকোনো হুমকির চেয়ে নজিরবিহীন।
আর এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি যদি স্থায়ী শান্তিতে রূপ নেয়ও, তবুও ইরান যুদ্ধ এবং ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কথাগুলো বিশ্বের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে মৌলিকভাবে বদলে দিতে পারে।
যে জাতি একসময় নিজেকে বিশ্বজুড়ে স্থিতিশীলতার কারিগর হিসেবে পরিচয় দিত, তারা এখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তি নাড়িয়ে দিচ্ছে। একজন প্রেসিডেন্ট, যিনি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিয়ম ও ঐতিহ্য ভাঙতে আনন্দ পান, তিনি এখন বিশ্বমঞ্চেও একই কাজ করছেন।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক তোলপাড়
ডেমোক্র্যাটরা মঙ্গলবার দ্রুত ট্রাম্পের বক্তব্যের নিন্দা জানান, কেউ কেউ এমনকি তাকে অপসারণের দাবিও তোলেন।
কংগ্রেস সদস্য জোয়াকিন কাস্ত্রো বলেন, এটা স্পষ্ট, প্রেসিডেন্টের মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটছে এবং তিনি নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য নন।
সিনেটে ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার বলেন, যেকোনো রিপাবলিকান সদস্য যদি ইরান যুদ্ধ বন্ধে ভোট না দেন, তবে এই পরিস্থিতির যা ফলাফল হবে তার দায়ভার তাদের নিতে হবে।
যদিও ট্রাম্পের নিজ দলের অনেকেই তাদের প্রেসিডেন্টের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তবে এটি ট্রাম্পের সচরাচর পাওয়া নিরঙ্কুশ সমর্থনের মতো ছিল না।
তবে হোয়াইট হাউজ সম্ভবত পালটা যুক্তি দেবে যে তাদের এই কঠোর কৌশল কাজ করেছে। আর যে প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা কমছে, নিজের দলেই সমালোচক বাড়ছে এবং উচ্চ জ্বালানি মূল্যের কারণে ধুঁকতে থাকা অর্থনীতির মোকাবিলা করছেন, তার জন্য এই সংঘাত থেকে যে কোনো উপায়ে বেরিয়ে আসাটাই এক বড় স্বস্তি।
অমীমাংসিত প্রশ্ন
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার সময় ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র তার সব সামরিক লক্ষ্য ‘অতিক্রম’ করেছে।
ইরানের সামরিক শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও তাদের সরকার এখনো ক্ষমতায় রয়েছে, তবে অনেক শীর্ষ নেতা বোমা হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন।
তবে এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত অনেক লক্ষ্যই এখনো অনিশ্চিত। ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম; যা তাদের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির মূল ভিত্তি তার বর্তমান অবস্থা অজানা। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মতো আঞ্চলিক প্রক্সি গ্রুপগুলোর ওপর দেশটির প্রভাব এখনো বজায় রয়েছে।
আর ইরান যদি হরমুজ প্রণালি টোল বা অন্য কোনো অর্থ প্রদানের শর্ত ছাড়াই পুরোপুরি খুলে দেয়ও তবুও এই ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তাদের আগের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি বার্তার পর এক বিবৃতিতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি বলেছেন, ইরান তার প্রতিরক্ষামূলক অভিযান বন্ধ করবে এবং ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে হরমুজে নিরাপদ যাতায়াতের সুযোগ দেবে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ১০ দফা পরিকল্পনার সাধারণ কাঠামো মেনে নিয়েছে।
সেই পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, যুদ্ধের ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং হরমুজের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে দেওয়া। ট্রাম্প আসলে এসব শর্তের কোনোটি মেনে নিচ্ছেন তা কল্পনা করা কঠিন। এখান থেকে বুঝা যায় আগামী দুই সপ্তাহের আলোচনা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
[বিবিসির প্রতিবেদনের ভাবানুবাদ]
চাটগাঁ নিউজ/জেএইচ





