ফরহাদ সিকদার: চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে চন্দনাইশ-সাতকানিয়া সীমান্তবর্তী কাটগড় এলাকায় দোহাজারী-কালিয়াইশ ১০০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টের পরিত্যক্ত ফার্নেস অয়েল বা তেলজাত বর্জ্য ‘মইল্যাখাল’ হয়ে সাঙ্গু নদীতে গিয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে নদীর জলজ জীববৈচিত্র্য, কৃষি ও স্থানীয় পরিবেশ হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা ও পরিবেশসংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যুৎকেন্দ্র সংলগ্ন মইল্যাখালের পানিতে তৈলাক্ত পদার্থের উপস্থিতি রয়েছে। খালটির প্রবাহ সাঙ্গু নদীর সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এসব বর্জ্য সাঙ্গুতে গিয়ে মিশছে ।
স্থানীয়দের দাবি, ২০১২ সালে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর পর থেকেই খোলা জায়গায় বর্জ্য তেল ফেলার কারণে খাল ও নদীর পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে খালে তৈলাক্ত বর্জ্য জমে থাকায় পানিতে তীব্র দুর্গন্ধও ছড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
কমেছে মাছ ও জলজ প্রাণীর উপস্থিতি
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, তৈলাক্ত বর্জ্যের কারণে মইল্যাখাল ও এর আশপাশের জলাশয়ে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণীর উপস্থিতি আগের তুলনায় কমে গেছে।
রসুলাবাদ এলাকার কৃষকেরা জানান, ১০ থেকে ১৫ বছর আগেও এই খালের পানি বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যেত। খালটিতে ছোট-বড় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণীও পাওয়া যেত। তবে বর্তমানে খালের পানি দূষিত হয়ে পড়ায় আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না।
তাদের আরও অভিযোগ, খালের দূষিত পানি আশপাশের ফসলি জমিতে প্রবেশ করছে। এতে কৃষিজমি ও ফসলের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
খালের পাশের বাসিন্দারা জানান, পানিতে তেলের মতো পদার্থের উপস্থিতি এবং তীব্র দুর্গন্ধের কারণে খালের আশপাশের পরিবেশও অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে।
বর্জ্য ফেলার অভিযোগ অস্বীকার বিদ্যুৎকেন্দ্রের
তবে খালে বর্জ্য ফেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ। দোহাজারী-কালিয়াইশ ১০০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শফির সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন মাত্র দুই মাস আগে। ফলে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তার জানা নেই। তবে খালে থাকা পদার্থকে তেল নয়, ‘ক্লাড’ বা তেলজাত বর্জ্য বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মোহাম্মদ শফি বলেন, বৃষ্টি ও বন্যার পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের এলাকায় ঢুকে পড়ায় সেখান থেকে এসব তেলজাত বর্জ্য খালে চলে গেছে। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো বর্জ্য খালে ফেলছে না এবং বর্জ্য যাওয়ার পথ ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, যেসব বর্জ্য খালে চলে গেছে, সেগুলোও অপসারণ করে খালটি পরিষ্কার করার কাজ চলছে।
খাদ্যশৃঙ্খলে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা
এসব তেলজাত বর্জ্য শাখা খাল হয়ে সাঙ্গু নদীতে প্রবেশ করলে এর সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সাইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক ড. শেখ আহমাদ আল নাহিদ।
তিনি বলেন, পানিতে এ ধরনের তেল ছড়িয়ে পড়লে উদ্ভিদকণা ও প্রাণীকণার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এসব ক্ষুদ্র জলজ জীব খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় এর প্রভাব পরবর্তী ধাপে বড় মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর ওপরও পড়তে পারে।
অধ্যাপক নাহিদ বলেন, হালদা বা কর্ণফুলী নদীর তুলনায় সাঙ্গু নদীতে তুলনামূলকভাবে দূষণ কম ছিল। সেখানে এ ধরনের দূষণ শুরু হলে দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তার ভাষ্য, তেল পানির সঙ্গে সহজে মিশে না গিয়ে পানির ওপর আস্তরণ তৈরি করতে পারে। এতে পানিতে সূর্যের আলো প্রবেশের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি জলজ উদ্ভিদ ও অণুজীবের স্বাভাবিক কার্যক্রমেও প্রভাব পড়তে পারে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল ধরেননি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও দূষণ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের দাবি, দ্রুত খাল থেকে বর্জ্য তেল অপসারণ, দূষণের উৎস শনাক্ত ও বন্ধ করা এবং খাল ও সাঙ্গু নদীর পানির গুণগত মান পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
স্থানীয়রা বলছেন, দূষণের উৎস বন্ধ করা না গেলে মইল্যাখাল ও সাঙ্গু নদীর জলজ পরিবেশের পাশাপাশি আশপাশের কৃষিজমি ও জনজীবনেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
চাটগাঁনিউজ/এফ এস





