ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ

চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক : সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ৯ শ্রমিক নিহতের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছেন জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের নেতারা। তাঁরা বলেছেন, এটি নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়; দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন ও সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীনতার কারণেই এমন মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে।

রবিবার (১৬ আগস্ট) বেলা ২টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধনে বক্তারা এসব কথা বলেন।

জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত। সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টুর সঞ্চালনায় এতে বক্তব্য দেন কবি আবুল মোমেন, বন্দর ও জাতীয় সম্পদ রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক (ডা.) এম আবু সাঈদ, ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সভাপতি এএম নাজিম উদ্দিন, ফোরামের কোষাধ্যক্ষ রিজওয়ানুর রহমান খান, অন্যতম সদস্য নুরুল আবসার, বাংলাদেশ ফ্রি ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কেএম শহিদুল্লাহ, বাংলাদেশ মুক্ত শ্রমিক ফেডারেশন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক মো. ইদ্রিস, জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মানিক মণ্ডল প্রমুখ।

আবুল মোমেন বলেন, একটি ইয়ার্ডে একই ঘটনায় ৯ শ্রমিকের প্রাণহানি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও উদ্বেগজনক। শ্রমিকের জীবনকে কোনোভাবেই শিল্পের উৎপাদন ও মুনাফার চেয়ে কম মূল্য দেওয়া যায় না। জাহাজভাঙা শিল্পে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মালিকপক্ষের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকেও কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

অধ্যাপক (ডা.) এম আবু সাঈদ বলেন, কর্মক্ষেত্রে একজন শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মালিক ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একটি দুর্ঘটনায় একসঙ্গে ৯ জন শ্রমিকের মৃত্যু প্রমাণ করে কোথাও না কোথাও গুরুতর নিরাপত্তা ঘাটতি ছিল। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।

এএম নাজিম উদ্দিন বলেন, জাহাজের ট্যাংক বা অন্য কোনো ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে শ্রমিকদের কাজ করানোর আগে গ্যাস পরীক্ষা ও অক্সিজেনের মাত্রা পরিমাপ করা বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল এবং কাজ চলাকালে নিয়মিত গ্যাস মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এসব নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না।

তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের পর্যাপ্ত রেসপিরেটরি মাস্ক ও অন্যান্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়া হয়নি কেন, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। শ্রমিকদের জন্য যথাযথ রেসপিরেটরি সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকলে এতগুলো প্রাণহানি হয়তো এড়ানো সম্ভব হতো।

তপন দত্ত বলেন, একটি ইয়ার্ডে একই ঘটনায় ৯ শ্রমিকের মৃত্যু অত্যন্ত ভয়াবহ ও নজিরবিহীন ঘটনা। জাহাজভাঙা শিল্পে গত ২৫ বছরে একসঙ্গে এত শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। এই মৃত্যুকে শুধু দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি ও দায়িত্বশীলদের অবহেলা রয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করতে হবে।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, যে জাহাজকে ‘গ্যাস ফ্রি’ সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছিল, সেই জাহাজের ট্যাংকে কীভাবে বিষাক্ত গ্যাস পাওয়া গেল। গ্যাস ফ্রি সার্টিফিকেট দেওয়ার আগে যথাযথ পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না এবং সার্টিফিকেট দেওয়ার পর জাহাজে নিয়মিত গ্যাস পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনতে হবে।

ফোরামের নেতারা বলেন, দক্ষ শ্রমিক ও অনুমোদিত কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানোর দাবি শ্রমিকদের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই জানানো হচ্ছে। কিন্তু সেই দাবি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। ফলে শ্রমিকদের প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।

তাঁরা বলেন, ফেরদৌস স্টিলের দুর্ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৯ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে শুধু তদন্ত কমিটি গঠন করলেই হবে না। তদন্ত অবশ্যই নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। তদন্তে দায়ীদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

তাঁরা নিহত ৯ শ্রমিকের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া, আহত শ্রমিকদের সম্পূর্ণ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং দুর্ঘটনার জন্য দায়ী মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার দাবি জানান।

প্রতিটি জাহাজে কাজ শুরুর আগে এবং কাজ চলাকালে বাধ্যতামূলক গ্যাস পরীক্ষা ও নিয়মিত গ্যাস মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ শ্রমিক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকের জীবন কোনোভাবেই মালিকের মুনাফার চেয়ে কম মূল্যবান নয়। শুধু তদন্ত কমিটি গঠন করে দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই। প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করে জবাবদিহি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

চাটগাঁ নিউজ/এসএ

Scroll to Top