চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক: আওয়ামী লীগের দাপুটে নেতাকর্মীদের গত বছরও ছিল রাজকীয় জীবন, জমজমাট ঈদ। দলের নেতাকর্মীরা আসতেন, সেলামি ও শুভেচ্ছা বিনিময় হতো। কিন্তু গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে তাদের এবারের বাস্তবতা ভিন্ন।
টানা ১৭ বছর পর চরম সংকটে ঈদুল ফিতর উদযাপন করেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। কেউ পালিয়ে দেশের বাইরে হাস্যোজ্বল ভঙ্গিতে আবার কারো ঈদ কাটছে নিরানন্দে কারা অভ্যন্তরে বসে। আবার ঈদ করতে অনেকে এলাকায় গিয়ে গ্রেফতারও হচ্ছেন।
এরই মধ্যে বিদেশে বসে অনেক নেতা রাজকীয় ঈদ উদযাপন করেছেন এমন ভঙ্গিমার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুলেছে সমালোচনার ঝড়।
বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে এবার কফির আড্ডায় দেখা গেছে আওয়ামী লীগের পলাতক চার মন্ত্রীকে। তারা হলেন— সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আব্দুর রহমান, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সাবেক নৌমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এবং সাবেক শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের নেতারা।
নাম প্রকাশে ইচ্ছুক কর্মীরা বলছেন— ঈদ তো সবার জন্যই। নেতারা যে ঈদ উদযাপন করতে পারবেন না, তা নয়। তবে তাদের সঙ্গে কর্মীদের যোগাযোগ ও সুখ-দুঃখের বিনিময় হলে ভালো হয়। কর্মীরা প্রাণ পায়। কিন্তু বর্তমানে বেশিরভাগ নেতাকর্মী তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন। তারা কোনো মাধ্যমেই যোগাযোগ রাখছেন না। সহযোগিতা তো পরের ব্যাপার।
এদিকে ভাইরাল হওয়া ছবির বিষয়ে জানা গেছে, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান মাহমুদ শরীফ বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তারা চিকিৎসারত ওই নেতাকে দেখতে মঙ্গলবার (১ এপ্রিল) হাসপাতালে যান। এবং সেখানকার একটি কফি শপে বসে তাদের এই আড্ডা।
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আলাদা আলাদাভাবে তাদের দেখা গেলেও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এইবারেই প্রথমবার চারজন সাবেক মন্ত্রীকে একসাথে দেখা গেছে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের লাখ লাখ নেতাকর্মী এবার ঈদের নামাজটাও পড়তে পারেননি। নতুন প্রজন্মের অনেক নেতাকর্মীর কাছে এটি একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা। সংগ্রাম ত্যাগ আর ক্রোধ মনে নিয়েই একটি প্রজন্ম লড়াই করছে সেই সাথে আছে পূর্ব প্রজন্মের পূর্ব পুরুষদের লড়াই সংগ্রাম। এই সময়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে বিদেশে অবস্থান করছেন অনেকেই। কিন্তু কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের কারও কারও যদি হাস্যোজ্জ্বল গেটটুগেদার করার ছবি আসে তাহলে তৃণমূল এতে ব্যথিত হয় ও প্রতিপক্ষের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছায় বলে দাবি করছেন মাঠ পর্যায়ে একাধিক কর্মী।
তবে নেতাদের দাবি, বিপদে তো সবাই। যে যত বড় নেতা, বিপদ তার তত বেশি। দেশ বিদেশে যে যেখানেই আছে, চরম বেকায়দায় আছে। তার পরও সাধ্যমতো সংযোগ রক্ষা করা প্রয়োজন। আমাদের অনেকেই সেটা করছেন না। এ কারণে কর্মীদের ক্ষোভ অমূলক নয়। তবে দলীয় সভাপতি নিজেই সবার সঙ্গে কানেক্টেড, এটাই আমাদের আশার দিক।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের এক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেন, কুশল বিনিময় করতে গিয়ে আমরা হাসি দেই। এই ছবি দেখে কেউ যদি মনে করে, আমরা ভালো আছি। তাহলে ভুল হবে। দেশ-বিদেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ভালো নেই। কারণ মব সন্ত্রাস তৈরি করে রাখা হয়েছে। সরকার ও বিএনপি-জামায়াতের তাণ্ডবে আমরা অতিষ্ঠ। প্রত্যেকে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।
তিনি বলেন, হ্যাঁ, এটা যৌক্তিক দাবি যে, নেতারা কর্মীদের খোঁজ নেবেন। বিপদে পাশে থাকবেন। কিন্তু আমরা তো সবাই বিপদগ্রস্ত। কে কার পাশে থাকবো? তারপরও সাধ্যমতো নির্বাচনী এলাকার নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করছি। এর বাইরেও যাদের পাওয়া যাচ্ছে, খোঁজ নিচ্ছি। এখন তো একে-অপরকে পাওয়াও মুশকিল।
ছবিটির বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন— এই ছবি নিয়ে সমালোচনার কিছু নেই। আমরা দীর্ঘদিন পর একসাথে হয়েছি। অনেক ধরণের কথা বার্তা আমাদের মধ্যে হয়েছে। পৃথিবীর যে যেই দেশে আছে, সবাই অসামান্য নির্যাতন নিপীড়নের মধ্যে আছে। আজ আওয়ামী লীগ নেই, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে কোনো ঈদ আনন্দ নেই। শেখ হাসিনা নেই, দেশের মানুষের মনে শান্তি নেই। ইউনূস সরকার বাংলাদেশে একটা তাণ্ডব তৈরি করেছে। রাজনৈতিক শিষ্টাচার ধ্বংস করে দিয়েছে। এর মধ্যেও আমাদের নেতাকর্মীরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে ছিল। রমজানের সংযমের মধ্য দিয়ে ফের আমরা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার শপথ নিয়েছি।
কারাগারে দাপুটে নেতাদের মলিন ঈদ—
দেশের বাইরে মুক্ত পরিবেশে পলাতক আওয়ামী নেতারা ঈদের নামাজ থেকে শুরু করে পরস্পরের মধ্যে কুশলাদি বিনিময় করতে পারলেও যারা পালাতে পারেননি, তাদের ঠিকানা এখন কারাগার। পরিবার-পরিজনছাড়া দাপুটে এসব নেতাদের এবারের ঈদ কাটছে নিরানন্দে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। অর্থবিত্ত বা ক্ষমতা, কী ছিল না তার? এখন সবই হাতছাড়া। অসহায় হয়ে ঈদ করছেন কারাগারে।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুও অসহায় ঈদ পালন করছেন কারাগারে। অথচ একসময় তার কাছে হাজিরা দিতে ও দোয়া নিতে হতো বহু শিল্পপতির। এমনকি বরিশাল অঞ্চলে নেতা হতে হলে হাতেগোনা যে দু-তিনজনের আশীর্বাদ প্রয়োজন হতো, তিনি তাদেরই একজন।
এদিকে সাবেক শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার শেষ বয়সে এসে কারাগারের যন্ত্রণা না নিতে পেরে সম্প্রতি রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ারই ঘোষণা দিয়েছেন।
বাড়িভর্তি মানুষ, সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মীসহ কি না ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের কথিত ছোটভাই সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের। অথচ সবচেয়ে প্রভাবশালী এই প্রতিমন্ত্রী এখন সবচেয়ে অসহায় ঈদ করছেন কারাগারে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, ড. আব্দুর রাজ্জাক, লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান, শাজাহান খান, কাজী জাফরউল্লাহ, ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনির অসহায়ত্বেও কেউ পাশে নেই। তাদের ঈদ কারাভ্যন্তরেই কাটছে নীরবে-নিভৃতে।
এর বাইরে আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, জাতীয় কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট বলরাম পোদ্দার, সাবেক এমপি হাজী মোহাম্মদ সেলিম, জাতীয় সংসদের সাবেক চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, রাউজানের প্রভাবশালী সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরী, এম এ মালেক, টেকনাফের গডফাদার খ্যাত আব্দুর রহমান বদি, সাবেক এমপি ও মানবতার ফেরিওয়ালা ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন, সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সাবেক মন্ত্রী ও বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, সাবেক ভূমিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ, সাবেক খাদ্য উপমন্ত্রী ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম, সাবেক ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার, সাবেক সংসদ সদস্য সাদেক খান, সাবেক এমপি ও হুইপ মাহবুব আরা বেগম গিনি, সাবেক এমপি মাসুদা সিদ্দীক রোজী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত, ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক বেনজীর হোসেন নিশিসহ দলটির জেলা-উপজেলা পর্যায়ের অসংখ্য নেতাকর্মী এবার কারা অভ্যন্তরে ঈদ করছেন।
পলাতক রয়েছেন যারা —
এদিকে দেশের বাইরে আছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসিম কুমার উকিল, সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, সুজিত রায় নন্দী, অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদ, প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন, দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, সাবেক এমপি পংকজ দেবনাথ, আওলাদ হোসেন প্রমুখ।
চাটগাঁ নিউজ/জেএইচ