চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক : চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত জঙ্গল সলিমপুরে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির প্রায় চার হাজার সদস্যের অংশগ্রহণে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করেছে যৌথ বাহিনী। সোমবার (৯ মার্চ) ভোর থেকে চলা এই অভিযানে কোনো কিছুই কমতি ছিল না। আকাশপথে কড়া নজরদারিতে ব্যবহার করেছে ড্রোন ও হেলিকপ্টার। ব্যাপক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিয়েও ব্যর্থ হয়েছে অভিযান। এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কাউকেই গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। যদিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দাবি করেছে, দিনভর অভিযানে ১৫ জনকে আটকসহ বেশ কিছু অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
দিনভর জঙ্গল সলিমপুরের অভিযান প্রসঙ্গ ছিল চট্টগ্রামবাসীর আলোচনায়। সবার ধারণা ছিল এই অভিযান নিশ্চয় বড় ধরণের সফলতা পাবে। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা যৌথ বাহিনীর জালে আটকা পড়বে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কিছুই হয়নি। তাই দিনশেষে অনেকে বলেছেন, ‘যত গর্জে তত বর্ষে না। যত বড় অভিযান, তত বড় ব্যর্থতা।’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের ধারণা, অভিযানের খবর আগেই পেয়েছে জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসীদের একটি অংশ। তাই গতকাল রাতেই প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে সন্ত্রাসীরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি যাতে ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয়। রাস্তার ওপর ট্রাক রেখে সড়কে যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। একটি নালার স্ল্যাবও তুলে ফেলা হয়।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরের প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর পাহাড়ি এলাকা নিয়ে জঙ্গল সলিমপুরে সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারায় থাকে সন্ত্রাসীরা। এখানে সন্ত্রাসীদের দুটি পক্ষ রয়েছে। একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং অপর পক্ষে রোকন উদ্দিন। ইয়াসিন গত জানুয়ারিতে ওই এলাকায় অভিযানে যাওয়া এক র্যাব কর্মকর্তাকে হত্যার মামলায় প্রধান আসামি। জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় রয়েছে তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। এখনও পাহাড় কেটে চলছে প্লট-বাণিজ্য। আর এই বাণিজ্য ও দখল টিকিয়ে রাখতে এলাকাটিতে গড়ে তোলা হয়েছে সন্ত্রাসী বাহিনী। এলাকাটিতে সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারায় থাকে এসব সন্ত্রাসী। র্যাবের ওপর হামলার আগে জঙ্গল সলিমপুরে গত বছরের অক্টোবরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে একজন নিহত হন। পরদিন সেখানে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলা ও মারধরের শিকার হন দুই সাংবাদিক।
পুলিশ ও জঙ্গল সলিমপুরের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলাকার ত্রাস ইয়াসিন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সীতাকুণ্ডের তৎকালীন সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের নেতা এস এম আল মামুনের অনুসারী ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ইয়াসিন নিজেকেও বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর অনুসারী দাবি করে আসছেন। তবে র্যাব কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে আসলাম চৌধুরী বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে তার কোনও অনুসারী নেই। ঘটনার সঙ্গে বিএনপির কেউ জড়িত নন।
পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে ছিন্নমূল ও আলীনগর নামে দুটি গ্রাম রয়েছে। ছিন্নমূলের পরেই আলীনগর। ছিন্নমূল যাওয়ার পর আলীনগর ঢোকার আগে রাস্তায় একটি ট্রাক দিয়ে ব্যারিকেড দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। যৌথ বাহিনীর লোকজন ট্রাকটি সরিয়ে সামনে যায়। কিছু দূর পরে সম্ভবত গতকাল রাতে একটি কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয়েছে। পরে কালভার্টের ওই অংশ ইট-বালু দিয়ে ভরাট করে যৌথ বাহিনীর গাড়ি আলীনগরে প্রবেশ করেছে।’
অভিযান শুরুর আগে কীভাবে এসব ঘটলো জানতে চাইলে নাজমুল হাসান বলেন, ‘এটি অনেক বড় অভিযান। এখানে বিভিন্ন বাহিনীর লোকজন আছে। জঙ্গল সলিমপুর এলাকা যারা নিয়ন্ত্রণ করে তাদের সিএনজি অটোরিকশার চালক থেকে শুরু করে বিভিন্ন সোর্স আছে। কোনোভাবে হয়তো অভিযানের কথা আগেই জেনে গেছে তারা। তবে এখন আমাদের অভিযান চলমান আছে। বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযান শেষ হলে বিস্তারিত জানানো হবে।’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা যায়, সকাল ৬টা থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে যৌথ বাহিনীর প্রায় ৪ হাজার সদস্য অংশগ্রহণ করেছেন। অভিযানের অংশ হিসেবে সকাল থেকে জঙ্গল সলিমপুরের চারপাশ ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলোতে বসানো হয় তল্লাশি চৌকি, যাতে অভিযান শুরুর পর কেউ পালিয়ে যেতে না পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে অভিযানে অংশ নেন। অভিযানের সময় সাংবাদিকদের জঙ্গল সলিমপুরের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
গত জানুয়ারি মাসে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন র্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক (নায়েব সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। এ ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানায় মামলা করে র্যাব। এতে মোহাম্মদ ইয়াসিন ছাড়াও ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া আসামি করা হয় অজ্ঞাতপরিচয় ২০০ জনকে। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, র্যাব সদস্যরা আসামি ধরতে গেলে তাদের ওপর সন্ত্রাসী মোহাম্মদ ইয়াসিনের নির্দেশে রামদা, কিরিচ ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালানো হয়। ছিনিয়ে নেওয়া হয় র্যাবের আটক করা এক আসামিকে। চার র্যাব সদস্যকে অপহরণ করে নিয়ে যায় আসামিরা। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ তাদের উদ্ধার করে। এ ঘটনার পর জঙ্গল সলিমপুরে সমন্বিত অভিযান চালানোর কথা বলা হয়। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তখন অভিযান চালানো হয়নি।
চাটগাঁ নিউজ/এসএ





