চট্টগ্রামে ভয়াবহ ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে আড়াই লাখ ভবন

চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক : দেশের ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকার অন্যতম বন্দর নগর চট্টগ্রাম। মিয়ানমারের মতো বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে এই অঞ্চলের প্রায় ৭০ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ চট্টগ্রাম নগরে থাকা ৩ লাখ ৮২ হাজার ভবনের মধ্যে ২ লাখ ৬৭ হাজার ভবন কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রিখটার স্কেলে ৭.৫ বা তার চেয়ে অধিক মাত্রার ভূমিকম্প হলে চট্টগ্রাম নগরে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে।

গত শুক্রবার (২৮ মার্চ) মিয়ানমারে ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। ভূমিকম্পের উত্পত্তিস্থল ছিল চট্টগ্রাম থেকে ৩০০ কিলোমিটারের মধ্যে। একই সময়ে চট্টগ্রামে দুই দফা ভূমিকম্প হলেও ক্ষয়ক্ষতি তেমন হয়নি।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্ণফুলী নদীর পশ্চিম তীর সংলগ্ন অধিকাংশ বৃহদাকার স্থাপনাই গড়ে উঠেছে বেলে মাটির ওপর যেখানে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, শাহ আমানত বিমানবন্দর, ইস্টার্ন রিফাইনারিসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। ভূমিকম্পের সময় সেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। কোনো পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। নগরীর বিভিন্ন অপ্রশস্ত সড়কের দুই পাশে গড়ে ওঠা অনেক ভবনে অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবিলা করাও কঠিন কাজ।

বড় ভূমিকম্পে কর্ণফুলী নদীর ওপর নির্মিত শতবছরের প্রাচীন কালুরঘাট সেতু ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যে কারণে নগরীর সঙ্গে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরেশিয়ান প্লেট পাশে থাকায় কক্সবাজার জেলা ভূমিকম্পের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। বড় ভূমিকম্প বা সুনামির সময় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।

ঝুঁকিতে আড়াই লাখের বেশি ভবন
সিডিএর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরে ৩ লাখ ৮২ হাজার ১১১টি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে একতলা ভবন রয়েছে ২ লাখ ৭৮ হাজার ৫টি। ২ থেকে ৫ তলাবিশিষ্ট ভবন রয়েছে ৯০ হাজার ৪৪৪টি। ৬ থেকে ১০তলা পর্যন্ত ভবনের সংখ্যা ১৩ হাজার ১৩৫। ১০তলার ওপরে ভবন রয়েছে ৫২৭টি। নগরে এখন ২০তলার বেশি ভবন রয়েছে ১০টি। এই বিপুলসংখ্যক ভবন নির্মাণ করা হলেও এগুলোর অধিকাংশই ইমারত বিধিমালা মানেনি।

ভবনের নকশা অনুমোদন থেকে নির্মাণকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সিডিএকে তদারকির পরামর্শ দিয়ে চট্টগ্রামের বেসরকারি ইউএসটিসি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. ইঞ্জিনিয়ার মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিম ছাড়া কলাম ও স্লাব বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে। নিচের তলাগুলোতে বাণিজ্যিক ও ওপরের দিকে আবাসিক সুবিধা রেখে নির্মিত ভবনগুলো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড-১৯৯৩ অনুসরণ করে ভবন নির্মাণের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ভূমিকম্প প্রতিরোধী নিয়মাবলী প্রয়োগ করলে ভবন নির্মাণ খরচ মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।

তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম নগরীর ১ হাজার ৩৩টি স্কুলের মধ্যে ৭৪০টি ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে আছে। অনেক স্কুলভবনই টেকসই নয়। বিভিন্ন ভবনের নিচের তলায় গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় স্কুল করা হয়েছে। এসব স্কুলকে টেকসই করার উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি স্কুল-কলেজে টেকসই আসবাবপত্র তৈরি করা প্রয়োজন যাতে ভূমিকম্পের সময় শিক্ষার্থীরা সেখানে আশ্রয় নিতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিকম্পের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে সেখানে কাঠ-বাঁশ দিয়ে বাড়ি তৈরি করার পরামর্শ দেন তিনি।

এদিকে, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের মতো বাংলাদেশেও একই ধরনের বড় ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চল ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। শনিবার (২৯ মার্চ) ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ সতর্কবার্তা জানানো হয়।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছে। রিখটার স্কেলে ভূমিকম্প দুটির মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৭ দশমিক ৭ ও ৬ দশমিক ৪। এতে দেশ দুটি বেশ ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ অঞ্চল উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস বলছে, ভূমিকম্প মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ভূমিকম্প প্রতিরোধী ভবন তৈরি করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ও পুরোনো ভবনগুলোর সংস্কার করতে হবে। বহুতল ও বাণিজ্যিক ভবনগুলোয় অগ্নিপ্রতিরোধের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের লাইন নিয়মিত চেক করতে হবে। ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স, পুলিশ ও হাসপাতালের জরুরি নম্বর সহজে দেখা যায় এমন স্থানে রাখতে হবে।
বাসায় টর্চলাইট, রেডিও, শুকনো খাবার, পানির মজুদ, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম ও হেলমেট রাখতে হবে।

চাটগাঁ নিউজ/এসএ

Scroll to Top