নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রামের বিভিন্ন বাজারে খোলা সয়াবিন তেল নির্ধারিত দামের চেয়ে অন্তত ৩০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। গায়েব হয়ে গেছে বোতলজাত সয়াবিন। একই সঙ্গে বেড়েছে খোলা পাম তেলের দামও। ঢাকাসহ সারাদেশে ঈদের আগেই বাড়তে থাকা তেলের দাম ঈদের পর হয়েছে আরও ঊর্ধ্বমুখী।
যদিও গত মাসে (মার্চ) বাণিজ্যমন্ত্রী দাবি করেছিলেন, দেশে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং দাম বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কিন্তু বাস্তব বাজার পরিস্থিতি তার বিপরীত চিত্রই তুলে ধরছে। ফলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, সরবরাহে ঘাটতি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সিন্ডিকেটের তৎপরতা সব মিলিয়েই ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কতিপয় ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করে আসছেন। বারবার উদ্যোগ নেওয়ার পরও সরকারি হস্তক্ষেপে দাম বাড়াতে পারেননি। বর্তমানে সরকার নির্ধারিত এক লিটার বোতলজাত তেলের দাম ১৯৫ টাকা, খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ টাকা ও পাম তেলের মূল্য ১৬৪ টাকা। তবে বাজারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
নগরীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খোলা সয়াবিন ২০০ থেকে ২১০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। আর পাম বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায়। আবার বিভিন্ন বাজারে উধাও বোতলজাত সয়াবিন তেল। কিছুৃ যায়গায় পাওয়া গেলেও তেলের সঙ্গে বিক্রেতারা চাপিয়ে দিচ্ছেন অন্য পণ্য। বাধ্য করছেন কিনতে অতিরিক্ত দামে।
ক্রেতাদের অভিযোগ, নানা অজুহাত দাঁড় করিয়ে সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়েছে সয়াবিনের বাজার। তাদের কেউ কেউ অবৈধ মজুদের দিকেও ঝুঁকছে। ফলে বাজারে কৃত্তিম সংকট তৈরী হয়েছে সয়াবিন তেলের, যার প্রভাব পড়ছে ভোক্তাদের ওপর। আর বিক্রেতাদের দাবি, মিলগেট পর্যায়ে দাম বাড়ার কারণেই খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়েছে।
আবার মিল মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানিতে বিঘ্ন ঘটছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের সংকটের অজুহাতে পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে পাইকারি বাজারে দাম বাড়তেই খুচরা বাজারেও দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
এদিকে আজ শুক্রবার (১০ এপ্রিল) নগরীর কয়েকটি খুচরা ও পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ৫ লিটারের সয়াবিন তেলের বোতল মিললেও সরবরাহ অনেকটাই কমে গেছে। আবার কিছু দোকানে খোলা সয়াবিন তেল মিললেও তা বিক্রি হচ্ছে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশিতে। আবার বোতলজাত তেল মিললেও সাথে কিনতে হচ্ছে চিনি বা ডাল।
খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন, ডিলাররা তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন। এ অবস্থা মাসখানেকের বেশি সময় ধরে চললেও গত তিন-চারদিন ধরে একেবারে অর্ডার নেওয়াই বন্ধ করে দিয়েছেন।
নগরীর অক্সিজেন বাজার এলাকার খুচরা বিক্রেতা সাইদুল ইসলাম বলেন, এখন তেলের অর্ডার তেমন নিচ্ছে না কোম্পানিগুলো। কোনো কোনো কোম্পানি বলছে, তেল নিতে হলে সঙ্গে অন্য পণ্য নিতে হবে। আমাদের বিভিন্ন পাইকারি দোকান থেকে তেল এনে বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে দামও রাখতে হচ্ছে বাড়তি।
নগরীর ২ নং গেট কর্ণফুলী মার্কেটে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পাইকারি বিক্রেতা জানান, আমাদের কাছে বোতলজাত সয়াবিন প্রয়োজনের তুলনায় অল্প। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দেখিয়ে কোম্পানিগুলো তেল সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। তাই আমাদেরও বাড়তি দামে তেল বিক্রি করতে হচ্ছে।
একই মার্কেটে বাজার করতে আসা বেসরকারী চাকরিজীবি সৈয়দ আহমেদ জামাল চাটগাঁ নিউজকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার যায় সরকার আসে কিন্তু আমাদের জনগণের কোনো লাভ হয় না। ঘুরেফিরে আমাদের বাড়তি দামেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হচ্ছে। আর ভোজ্যতেল হচ্ছে রান্নার প্রধান আইটেম। বাড়তি দামে না কিনেও উপায় থাকে না।
আরেক চাকরীজীবি মোক্তার হোসেন বলেন, অনেক আশা আকাঙ্খা নিয়ে জনগণ বিএনপি সরকারকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছে। এই সরকারের কাছে অনুরোধ তারা বাজার তদারকিতে যেন মনোযোগ দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে ব্যবহার করে মধ্যসত্বভোগীরা সিন্ডিকেট তৈরী করে বাড়তি দামে তেল বিক্রি করছে। তাদের আইনের আওতায় এনে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা গেলে আমরা ছোট চাকরীজীবিরা কিছুটা হলেও সস্তি পাব।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন চাটগাঁ নিউজকে বলেন, ভোজ্যতেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় বাস্তবে কোনো ঘাটতি নেই। দীর্ঘদিন ধরেই কিছু ব্যবসায়ী বিভিন্ন অজুহাতে দাম বাড়ানোর সুযোগ খুঁজছিলেন, আর বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে তারা সেই সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছেন।
তিনি আরো জানান, আমরা “অসাধু ব্যবসায়ীর কারসাজিতে ভোজ্যতেল বাজার থেকে উধাও’’ শিরোনামে আগামীকাল (শনিবার) সকাল সাড়ে ১০টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব চত্ত্বরে এক মানববন্ধনের আয়োজন করেছি। এতে তিনি চট্টগ্রামের সকল শ্রেণি পেশার মানুষকে উপস্থিত থাকার অনুরোধ করেন।
দেশে তেলের চাহিদা ও উৎপাদন সক্ষমতা
দেশে প্রতিদিন ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় সাড়ে ৫ হাজার টন, প্রতি মাসে ১ লাখ ৭০ হাজার টন ও বছরে সর্বমোট ২৪ লাখ টনের মতো। তবে কিছুটা ব্যতিক্রম রমজান মাস। রমজান মাসে মানুষের খাদ্য তালিকা পরিবর্তন হওয়ায় চাহিদা বেড়ে দিগুণ হয়ে যায়। এর মধ্যে স্থানীয়ভাবে সরিষা ও রাইসব্রান থেকে উৎপাদন হয় প্রায় ৩ লাখ টন। চাহিদার বাকি অংশ বিশ্ব বাজার থেকে অপরিশোধিত সয়াবিন, পাম ও সয়াবিন সিড আমদানি করে সরবরাহ করা হয়।
ট্যারিফ কমিশনের তথ্য মতে, দেশে সবচেয়ে বেশি ভোজ্যতেল উৎপাদন সক্ষমতা টিকে গ্রুপের। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিদিন সাড়ে ৭ হাজার টন তেল পরিশোধন করতে পারে। এর পর রয়েছে সিটি গ্রুপ ও মেঘনা গ্রুপ। প্রতিষ্ঠান দু’টির দৈনিক পরিশোধনের সক্ষমতা যথাক্রমে সাড়ে ৩ হাজার টন ও ২ হাজার ৪০০ টন। এভাবে ১২ প্রতিষ্ঠানের দৈনিক পরিশোধন ক্ষমতা সাড়ে ২৫ হাজার টন। বার্ষরিক হিসাবে যা দাঁড়ায় ৭৬ লাখ ৫০ হাজার টনের মতো।
চাটগাঁ নিউজ/জেএইচ





