চট্টগ্রামেও চোখ রাঙাচ্ছে হাম, আতঙ্কে অভিভাবকরা!

জাহিদ হাসান: চট্টগ্রামসহ দেশের অন্তত ১০টি জেলায় হাম রোগ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। শিশুদের মধ্যে হাম সদৃশ উপসর্গ নিয়ে রোগী বাড়ার খবরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে অভিভাবকদের মনে, দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। তাইতো চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে জ্বর, চোখ লাল হওয়া, কাশি ও শরীরে লাল ফুসকুড়ি নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা, নরসিংদী, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা, ভোলায় সংক্রমণ বেশি। অন্য কিছু জেলায়ও শিশুরা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসছে। এদিকে চলতি মার্চ মাসে শুধু রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেই ১৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

চিকিৎসকেরা বলছেন, সময়মতো টিকা না নেওয়া, টিকার সংকট ও সরকারি বুস্টার ডোজ সময়মতো না আসায় হামের প্রকোপ বেড়েছে। তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, হামের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার সর্বোচ্চ প্রস্তুত রয়েছে।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে এবং ভাইরাসজনিত উচ্চ সংক্রামক রোগ হওয়ায় হাঁচি-কাশি, কথা বলা বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। হামের জটিলতা থেকে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, চোখ-মাথায় প্রদাহে আক্রান্ত হয় শিশু। এসব শিশুকে হাসপাতালে আলাদা ব্যবস্থাপনায় রেখে চিকিৎসা দিতে হয়।

এদিকে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের একাধিক সূত্র জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের মধ্যে ভাইরাস জ্বর ও নিউমোনিয়ার পাশাপাশি হাম-সদৃশ উপসর্গও দেখা যাচ্ছে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব ঘোষণা করা হয়নি, তবে টিকাদানে অনীহা ও সচেতনতার ঘাটতিকে সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এর শিশু বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত কয়েক সপ্তাহে জ্বর ও ফুসকুড়ি নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুর সংখ্যা প্রায় অর্ধশতাধিক।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন চিকিৎসক জানান, ‘অনেক শিশুই হাম বা হাম-সদৃশ লক্ষণ নিয়ে আসছে। তবে ল্যাব কনফার্ম ছাড়া নিশ্চিত করে বলা যাবে না হাম হয়েছে কি না। যদিও অভিভাবকরা এ নিয়ে বেশ আতঙ্কিত। আমরা তাদের শান্ত রাখার এবং সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছি।’

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘টিকাদান কর্মসূচি নিয়মিত চললেও অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে শিশুরা সময়মতো টিকা পাচ্ছে না। এতে করে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে।’

খোঁঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেবল নগরেই নয়- গ্রামেও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে হাম সদৃশ্য এসব উপসর্গ।

লোহাগাড়া উপজেলার বাসিন্দা সাদিয়া জাহান চাটগাঁ নিউজকে বলেন, ঈদের তিনদিন আগে আমার তিন বছরের বাচ্চার শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিয়েছিল। তার জ্বরের পাশাপাশি নিউমোনিয়াও দেখা দেয়। তখন হামের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। ডাক্তার ঔষুধ দিয়েছে নেবুলাইজার করা হয়েছে একাধিকবার। এখন কিছুটা সুস্থ হলেও হামের আতঙ্ক পিছু ছাড়ছে না।

চট্টগ্রাম নগরীর বহদ্দারহাট, হালিশহর, কাজির দেউরি ও পাহাড়তলী এলাকায় কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের সন্তানরা সম্প্রতি জ্বর ও ফুসকুড়িতে আক্রান্ত হয়েছে। কেউ কেউ প্রাথমিকভাবে এটিকে সাধারণ ভাইরাস জ্বর ভেবে অবহেলা করলেও পরে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছেন। পরে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে জেনে তারাও তাদের সন্তানদের নিয়ে আতঙ্কে আছেন বলেও জানান।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার (২৬  মার্চ) ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে এক অজানা রোগে মারা যায় সহকারী এটর্নি জেনারেল এডভোকেট কে এম সাইফুল ইসলামের ২ বছরের কন্যাশিশু শেহরিশ। কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার এই বাসিন্দা দেশসেরা ডাক্তার দেখিয়েও মেয়েকে বাঁচাতে পারেননি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রমজানের শেষদিকে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যায় শেহরিশ। প্রথমে সবাই ফুড পয়জনিং ভাবলেও অবস্থা বেগতিক দেখে ডাক্তারের শরণাপন্ন হন। পরে কিছুটা সুস্থ হলে আনন্দচিত্তে বাবার কাঁধে চড়ে চট্টগ্রাম নগরী থেকে গ্রামের বাড়ি পেকুয়ায় চলে যায় ছো্ট্ট শেহরিশ। পরে ঈদের দিন হালকা জ্বর আসে যেটি ঈদের দ্বিতীয় দিন আরো বেড়ে যায়। সেই সাথে দেখা দেয় শ্বাসকষ্ট। কালক্ষেপণ না করে দ্রুত চট্টগ্রাম নগরীতে নিয়ে আসা হয় শিশু সেহরিশকে। চট্টগ্রাম থেকে নেয়া হয় ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে। সেখানেই গত বৃহস্পতিবার মৃত্যু হয় শিশুটির।

একরাশ হতাশা নিয়ে সেহরিশের পিতা এডভোকেট কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমার মেয়েকে দেশের সেরা শিশু চিকিৎসকদের দেখিয়েছি। চিকিৎসার কোনো কমতি রাখিনি। কিন্তু কী থেকে কী হয়ে গেল! কী রোগে আমার মেয়েটা মারা গেল জানতেই পারলাম না! তার শারিরীক পরীক্ষা নিরীক্ষার আগেই মেয়েটি আমাদের বাঁধন ছিন্ন করে পরপারে চলে গেল।’

তবে ডাক্তারদের ধারণা, শিশুটির শরীরে হামের উপসর্গ ছিল। তবে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করায় সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, দেশে হামের টিকার সংকট ছিল এবং এখনও আছে। প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় দ্রুত ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে টিকা কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরো জানান, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালকে হামের জন্য ডেডিকেটেড করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষেণ করা হচ্ছে। ডিএনসিসির কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য সুবিধাও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া আইসিইউ ও ভেন্টিলেটরের সংখ্যা বাড়ানো এবং নবজাতকদের জন্য নতুন ভেন্টিলেটর সংযোজনের কথাও জানান মন্ত্রী।

কেন এই প্রাদুর্ভাব

দাতা সংস্থাগুলোর একটি সূত্র বলছে, এ বছরের ৪ জানুয়ারি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথম হাম শনাক্ত হয়। ১০ জানুয়ারি ক্যাম্প এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়। একই সময় রাজধানীর বস্তি এলাকায় হামের রোগী বৃদ্ধি পেতে থাকে।

বাংলাদেশ হামমুক্ত দেশ নয়। তবে টিকা কর্মসূচির কারণে হামের প্রকোপ কমে এসেছিল। জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, শিশুরা নিয়মিত টিকা পাচ্ছে না। দেশে বেশ কয়েক বছর হাম ও রুবেলা টিকার ক্যাম্পেইনও হয় না।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, শিশুদের ৯ মাস বয়সে হামের টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। অন্যদিকে ক্যাম্পেইনের সময় ৯ মাস বয়স থেকে ১০ বছরের সব শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। সর্বশেষ জাতীয় ক্যাম্পেইন হয়েছে ২০২০ সালে। তখন ৩ কোটি ৪০ লাখ শিশুকে এই টিকা দেওয়ার কথা ছিল। তার আগে ক্যাম্পেইন হয়েছিল ২০১৪ সালে।

স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান নিশ্চিত করা। পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে চট্টগ্রামে হাম সংক্রমণ আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করতে পারে। তাই সচেতনতা বৃদ্ধি ও টিকাদান জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বিশেষজ্ঞরা।

চাটগাঁ নিউজ/জেএইচ

Scroll to Top