গ্যাস অনুসন্ধানে সাগর ও স্থলভাগের ৪৭ ব্লকে দরপত্রের প্রস্তুতি

চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক: সাগরের পাশাপাশি স্থলভাগেও তেল গ্যাস অনুসন্ধানের আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করার প্রস্তুতি চলছে। নতুন সরকারের অগ্রাধিকার ১৮০ দিনের কর্মসূচির মধ্যে থাকছে বলে নিশ্চিত করেছেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।

সচিব আরও জানিয়েছেন, পার্বত্য এলাকার একটি ব্লক (২২এ ও ২২বি) দরপত্র থেকে বাদ থাকছে। গভীর সমুদ্রে ১৫টি এবং অগভীর সমুদ্রে ১১টি ব্লক এবং স্থলভাগে ২১ ব্লকে তেল গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্র আহ্বান করার প্রস্তুতি চলছে।

অথচ দূর্গম ও জটিল ভূ-কাঠামো পার্বত্য এলাকায় বাপেক্স কাজ করতে পারবে না উল্লেখ করে অনসোর পিএসসি প্রণয়ন করা হয়। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এমন ভাবনায় দুই ধরণের প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে, কেউ বলছে এতে গ্যাস অনুসন্ধানে গতি পাবে, দ্রুত বাড়বে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন।

অপরপক্ষ মনে করছে সব গ্যাস ফিল্ড বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া দেশের জন্য ভয়ানক হবে। কারণ বিদেশি কোম্পানি সবার আগে দেখবে তার মুনাফা। এখন যে কমদামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, তা আর কমদামে পাওয়ার সুযোগ থাকছে না। একলাফে কয়েকগুণ বেড়ে যাবে গ্যাসের উৎপাদন খরচ।

অনসোর ব্লকে গ্যাসের দাম ৮ ডলারের (১ হাজার ঘনফুট) বেশি হতে পারবে না বলে পেট্রোবাংলা সুত্র ইঙ্গিত দিয়েছে। প্রস্তাবিত দর বহুজাতিক কোম্পানির (শেভরন ও টাল্লো) সঙ্গে ইতিপুর্বে সম্পাদিত চুক্তির তুলনায় প্রায় ৫ ডলারের মতো বেশি।

শেভরন বাংলাদেশকে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম দেওয়া হয় ৩৩৯ টাকা (২.৭৬ ডলার), আর টাল্লোর সঙ্গে চুক্তি রয়েছে ২৮৪ টাকা (২.৩১ ডলার)।বহুজাতিক কোম্পানির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ৩টি কোম্পানির কাছ থেকে গ্যাস কিনে থাকে পেট্রোবাংলা। সিলেট গ্যাস ফিল্ড কেম্পানি ও বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানিকে প্রতি হাজার ঘনফুটের দাম দেওয়া হয় ২৮ টাকার মতো, অন্যদিকে বাপেক্সকে দেওয়া হয় ১১২ টাকার মতো।

অতীতে পিএসসি খসড়ার উপর মতামত নেওয়া হলেও মডেল পিএসসি-২০২৩ এ গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় গোপনীয়তার মাধ্যমে করা হয়েছে অনসোর পিএসসি।

বিভিন্ন সুত্র জানিয়েছে, অফসোর পিএসসি গ্যাসের দর ব্রেন্ট ক্রডের ১০ শতাংশ আর অনসোরে ব্রেন্ট ক্রড অয়েলের ৮ শতাংশ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। কনসালটেন্ট প্রতিষ্ঠান সাড়ে ৯ শতাংশ করার প্রস্তাবনা দিলেও যৌথসভায় ক্যাপিং করে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। ক্রডের দাম অনেকে বেড়ে গেলেও ৮ ডলারের বেশি হবে না বলে আভাস পাওয়া গেছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ক্রড অয়েলের ব্যারেল প্রতি দাম ১৪০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছিল। যা বর্তমান ৯৫ ডলারের কাছাকাছি রয়েছে। অর্থাৎ বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়া হলে প্রায় ৯৮৪ টাকা (৮ ডলার/প্রতি ডলার ১২৩ টাকা) খরচ পড়বে।

মডেল পিএসসি-২০২৩ (উৎপাদন ও বন্টন চুক্তি) এর আলোকে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য ২০২৪ সালের মার্চে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন কোম্পানি এক্সনমবিল ও শেভরন, মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস, নরওয়ে ও ফ্রান্সের যৌথ কোম্পানি টিজিএস অ্যান্ড স্লামবার্জার, জাপানের ইনপেক্স করপোরেশন ও জোগম্যাক, চীনের সিনুক, সিঙ্গাপুরের ক্রিস এনার্জি এবং ভারতের ও এনজিসি আগ্রহ প্রকাশ করে বিভিন্ন সময় পেট্রোবাংলার সঙ্গে যোগাযোগ করে। এর মধ্যে সমুদ্রে বহুমাত্রিক জরিপের তথ্য কিনেছিল শেভরন, এক্সনমবিল, ইনপেক্স, সিনুক ও জোগোম্যাক। ৬টি কোম্পানি দরপত্র গ্রহণ করলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ নানা কারণে দরপত্র জমাদান থেকে বিরত থাকে।

কারণ জানতে পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয় কোম্পানিগুলোকে। তারা গভীর সমুদ্র থেকে স্থলভাগ পর্যন্ত পাইপলাইনের খরচ, ডব্লিউপিপিএফ এবং গ্যাসের দাম নিয়ে আপত্তির কথা জানায়।অন্যদিকে চায়না ন্যাশনাল অফশোর অয়েল কর্পোরেশন (সিএনওওসি) তার জবাবে লিখেছে, পেট্রোবাংলার ডাটা বিক্রির জন্য যে প্যাকেজ মূল্য নির্ধারণ করেছিল, তার দর অনেক বেশি ছিল।

এক কমিটির রিপোর্টের প্রেক্ষিতে ডব্লিউপিপিএফ (শ্রমিকদের লভ্যাংশ অংশগ্রহণ তহবিল) ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে দেড় শতাংশ করা এবং সঞ্চালন পাইপের খরচসহ মডেল পিএসসি-২০২৩ আপডেট করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মোঃ এরফানুল হক।

মডেল পিএসসি ২০০৮ প্রণয়ন কমিটির প্রধান মকবুল ই-এলাহী চৌধুরী বলেন, অনেকে মনে করেছিলেন গ্যাসের দাম বাড়ালেই কোম্পানিগুলো দৌড়ে আসবে। সেই ভাবনা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কেনো জমা হয়নি সেটা তালাশ করার পাশাপাশি কেনো মাত্র ৭টি কোম্পানি দরপত্র কিনেছে সেটাও দেখা দরকার ছিল। পিএসসিতে শর্ত দেওয়া হয়েছে দৈনিক ২০ হাজার ব্যারেল (তেলের সমান) গ্যাস উত্তোলন করে এমন কোম্পানি দরপত্র কিনতে পারবে। এখানেইতো অনেক কোম্পানি বাদ পড়ে গেছে। আমি মনে করি গভীর সমুদ্রের ক্ষেত্রে ১০ হাজার এবং অগভীর সমুদ্রের ক্ষেত্রে ৫ হাজার ব্যারেল হওয়া উচিত। তাহলে আরও অনেক বেশি কোম্পানি অংশ নিতে পারবে।

তিনি বলেন, আরেকটি অন্যতম কারণ হচ্ছে ডাটা প্যাকেজের দাম অনেক বেশি। কোন কোন প্যাকেজের দাম মিলিয়ন ডলারের মতো। অন্য দেশে এসব ডাটা ফ্রি দেয়। ১৯৭৪ সালে আমাদের দেশে এসব ডাটা উন্মুক্ত ছিলো, তখন অনেক বেশি কোম্পানি অংশ নিয়েছিলো।

গভীর সমুদ্রে ১৫টি এবং অগভীর সমুদ্রে ১১টি ব্লক আছে। ২০০৮ সালে ডিএস-১০ ও ডিএস-১১ জন্য আমেরিকান কোম্পানি কনোকো ফিলিপসের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। কনোকো গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিসহ কিছু শর্ত সংশোধনের আবেদন করে। বাংলাদেশ সেই শর্তে সাড়া না দিলে ২০১৪ সালে ছেড়ে চলে যায়। অন্যদিকে অফসোর বিডিং রাউন্ড ২০১২ আওতায় ওএনজিসি ভিদেশ লিমিটেড এসএস-৪ ও এসএস-৯ এর চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। ওএনজিসি ভিদেশ কাঞ্চন-১ কূপ খনন করেছে, আরও দু’টি অনুসন্ধান কূপ খনন করবে। ২০১৭ সালে এসএস-১২ ব্লকের জন্য আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি পসকো দাইয়ুর সঙ্গে চুক্তি করে পেট্রোবাংলা। ২০২০ সালে ব্লক ফেল চলে যায় পসকো দাইয়ু। ২০২৪ সালের আগে সর্বশেষ ২০১৬ সালে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। এরপর ২০১৯ সালে পিএসসি আপডেট করা হলেও দরপত্র ডাকা হয়নি। কয়েক মাসের কাজ পিএসসি আপডেট করতেই ৫ বছর সময় পার করে দেয় আওয়ামী লীগ সরকার।

বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে আগ্রহী করে তোলার জন্য অনেক জায়গায় ছাড় দেওয়া নতুন পিএসসি-২০২৩ চুড়ান্ত করা হয়। প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম ধরা হয়েছে ব্রেন্ট ক্রডের ১০ শতাংশ দরের সমান। যা আগের পিএসসিতে অগভীর ও গভীর সমুদ্রে যথাক্রমে ৫.৬ ডলার ও ৭.২৫ ডলার স্থির দর ছিল।

চাটগাঁ নিউজ/জেএইচ

Scroll to Top