চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক: টানা ২৫ দিনের তীব্র গ্যাস সংকটের পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও এলএনজি কার্গোর অভাবে আবারও সরবরাহ কমে গেছে। নতুন এলএনজি কার্গো না আসায় কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে আজ বুধবার (১৯ আগস্ট) বেলা ৩টায় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে সারা দেশে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
জানা গেছে, টার্মিনালটির নিজস্ব মজুত থেকে এতদিন গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। সেই মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে কেবল সামিটের টার্মিনাল থেকেই এলএনজি সরবরাহ করা হচ্ছে। যা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। চট্টগ্রামে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৫০ থেকে ৪৫০ মিলিয়ন মিলিয়ন ঘনফুট। কেজিডিসিএলের আওতাধীন এ অঞ্চলের গ্যাস সরবরাহ মূলত আমদানিকৃত এলএনজিনির্ভর। সাম্প্রতিক সংকটে সরবরাহ ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে যাওয়ায় শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকরা ভোগান্তিতে পড়েন।
এদিকে পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (১৯ আগস্ট) দুপুর ১২টায় দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২ হাজার ২৮৯ মিলিয়ন ঘনফুট, যার মধ্যে এলএনজি থেকে আসছিল ৬৬১ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে এক্সিলারেটর টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার প্রভাবে সন্ধ্যা ৬টার দিকে এলএনজি সরবরাহ কমে ৫৬২ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়ায় এবং জাতীয় সঞ্চালন লাইনে মোট গ্যাস প্রবাহ কমে ২ হাজার ১৮৯ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বুধবার দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে এক্সিলারেটর টার্মিনালে থাকা এলএনজির সর্বশেষ মজুতও শেষ হয়ে আসে। এর ফলে টার্মিনালটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই অচলাবস্থার মূল কারণ এলএনজি কার্গোর ঘাটতি। যদিও এর আগে টার্মিনালটির বয়লার মেরামত নিয়ে কিছু কারিগরি বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল এবং এক্সিলারেটর মেরামতের জন্য ৭২ ঘণ্টা সময় চেয়েছিল, তবে শেষ পর্যন্ত বয়লার সচল হলেও পর্যাপ্ত এলএনজি মজুত না থাকায় সরবরাহ চালু রাখা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে কেবল সামিটের এলএনজি টার্মিনালটি সচল রয়েছে এবং সেখান থেকেই জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, আগস্টে মোট নয়টি এলএনজি কার্গো সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল। এর মধ্যে দরপত্রের মাধ্যমে তিনটি, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে একটি, স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে একটি এবং সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে চারটি কার্গো সংগ্রহের কথা। তবে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে কেনা চারটি কার্গোর সরবরাহ সময় নিয়ে এখন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে আরও পাঁচটি এলএনজি কার্গো কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগস্টের জন্য তিনটি ও সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের জন্য দুটি কার্গো কিনতে দরপত্র আহ্বান করা হলেও পাঁচটির মধ্যে মাত্র দুটির জন্য দর পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাকি কার্গোগুলোর জন্য পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হতে পারে।
এদিকে গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে চট্টগ্রামের শিল্প উৎপাদন ও বন্দরনির্ভর অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। ইতোমধ্যে সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, আনোয়ারা, কালুরঘাট ও ফৌজদারহাটসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি ও পরিবহন সংকটও নগরবাসীর ভোগান্তি বাড়াচ্ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে ক্রয়াদেশ পাওয়া সরবরাহকারীরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি (ডকুমেন্টেশন) ও আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে পারেনি। তাদের জাহাজ না আসায় ইতিমধ্যে দরপত্র আহ্বান করে নতুন এলএনজি জাহাজ আনা হচ্ছে। সরবরাহ ধরে রাখা যাবে, কোনো সমস্যা হবে না।
উল্লেখ্য, কক্সবাজারের মহেশখালীতে আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির এবং অন্যটি দেশীয় কোম্পানি সামিটের। গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনার পর এক্সিলারেটের টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে চলতি সপ্তাহের শনিবার এটি আবার পুরোদমে এলএনজি সরবরাহের জন্য প্রস্তুত হয়। তবে নতুন কার্গো না আসায় পুরোনো মজুত থেকে সীমিত পরিমাণে গ্যাস সরবরাহ শুরু করে। সোমবার থেকে সেই সরবরাহও কমতে থাকে।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার একটি এলএনজি কার্গো দেশে আসার কথা রয়েছে। সেটি সামিটের টার্মিনালে যুক্ত হতে পারে। অন্যদিকে এক্সিলারেটের জন্য একটি কার্গো ২৩ বা ২৪ আগস্ট আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে। ফলে আগামী কয়েক দিন এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
চাটগাঁ নিউজ/জেএইচ





