‘ইরান যুদ্ধ’ যেভাবে প্রভাব ফেলছে ভারতের কনডম শিল্পে!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংঘাতের আঁচ এবার পৌঁছেছে ভারতের সহজলভ্য জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি কনডমের উৎপাদনে। ইরান যুদ্ধের জেরে দেশটিতে এলপিজি সরবরাহ যেমন বড় ধাক্কা খেয়েছে এবং সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে, ঠিক তেমনই এবার দেশটির প্রায় ৮ হাজার ১৭০ কোটি রুপির বিশাল কনডম উৎপাদন শিল্প এক ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে।

এই যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল ও বাণিজ্য সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় দেশটিতে কনডমের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে দাম বাড়ার আশংকায় রয়েছে সহজলভ্য পণ্য হিসেবে পরিচিত ‘কনডম’। এছাড়া বাংলাদেশ ভারতের কনডম ক্রেতাদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে। তাইতো ভারতের কনডম সংকট ভোগাবে বাংলাদেশকেও। আর দাম বাড়লে বাংলাদেশকেও কিনতে হবে চড়া মূল্যে!

এদিকে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম এনডিটিভির বরাতে জানা গেছে, এইচএলএল লাইফকেয়ার, কিউপিড লিমিটেড ও ম্যানকাইন্ড ফার্মার মতো ভারতের শীর্ষস্থানীয় কনডম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো কাঁচামাল পাচ্ছে না। কনডম উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য পেট্রোকেমিক্যাল ও লুব্রিকেন্ট সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই খাতের উৎপাদন খরচ ইতোমধ্যে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে।

বছরে ৪০০ কোটিরও বেশি কনডম উৎপাদনকারী এই বিশাল শিল্পটি এখন রীতিমতো হুমকির মুখে। লুব্রিকেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত সিলিকন অয়েলের তীব্র সংকট যেমন বাজারে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, তেমনি কনডমের কাঁচা ল্যাটেক্স স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় অ্যামোনিয়ার আমদানিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মূলত ভারতের প্রয়োজনীয় অ্যামোনিয়ার প্রায় ৮৬ শতাংশই আসে সৌদি আরব, কাতার ও ওমান থেকে, যা হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার কারণে সময়মতো পৌঁছাতে পারছে না। তার ওপর অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল ও পিভিসিসহ অন্যান্য প্যাকেজিং উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন প্রক্রিয়া অনেক ধীর হয়ে পড়েছে। প্রতি কেজিতে অ্যামোনিয়া ও সংশ্লিষ্ট পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের দাম ০.৪৮ ডলার (প্রায় ৪৫ টাকা) থেকে বেড়ে ০.৬৮ ডলার (প্রায় ৬৩.৪ টাকা) পর্যন্ত হয়েছে।

ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের সুরক্ষায় কনডম সুলভ মূল্যে পৌঁছে দিতে সাধারণত ‘বেশি বিক্রি ও স্বল্প মুনাফা’র ব্যাবসায়িক মডেল অনুসরণ করা হয়। কিন্তু কাঁচামালের অভাব এবং উৎপাদন খরচ অনির্দিষ্ট হয়ে পড়ায় এই মডেলটি এখন বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে।

সম্প্রতি জ্বালানি ও বিদ্যুতের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে দেশটির অভ্যন্তরীণ পেট্রোকেমিক্যাল ইউনিটগুলোর বরাদ্দ ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা কনডম উৎপাদনের সংকটকে আরও বাড়াবে। ইতোমধ্যে দিল্লি ও মুম্বাইয়ের মতো বড় শহরের ফার্মেসিগুলোতে সরবরাহ ঘাটতির চিত্র ফুটে উঠছে এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে খুচরা পর্যায়ে কনডমের দাম ব্যাপক হারে বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতির সুদূরপ্রসারী ঝুঁকি নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ভারতীয় মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (আইএমএ) সাবেক সভাপতি রাজীব জয়দেবন সতর্ক করে বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের প্রভাব সরাসরি গর্ভনিরোধক উৎপাদনে পড়ছে। এর সবচেয়ে বড় শিকার হবে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী। সামান্য মূল্যবৃদ্ধির কারণেও তারা নিয়মিত কনডম ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে পারে। এর ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যুহার বৃদ্ধি এবং এইচআইভিসহ অন্যান্য যৌনবাহিত রোগ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও স্বাস্থ্য বিপর্যয় তৈরি হতে পারে।’

পপুলেশন ফাউন্ডেশন অব ইন্ডিয়ার নির্বাহী পরিচালক পুনম মুতরেজা বলেন, ‘স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সুফল পেতে হলে মানুষের কাছে গর্ভনিরোধক পৌঁছনোর ব্যবস্থা মজবুত করতে হবে আর গর্ভনিরোধনে যে পুরুষদেরও দায়িত্ব আছে, সেটাও স্বাভাবিক করে তোলা দরকার। তাই কনডমের ঘাটতি বা দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে কিশোরী অবস্থায় গর্ভবতী হয়ে পড়ার ঘটনা বেড়ে যেতে পারে’।

চাটগাঁ নিউজ/জেএইচ

Scroll to Top