চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক : শ্রমিক-কর্মচারীর ডাকা ধর্মঘটে অচল হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। গত দুই দিনে বের হয়নি একটি কনটেইনারও। জাহাজ থেকে প্রতিদিন গড়ে আট হাজার কনটেইনার ওঠানামা করা জেটিও স্থবির। প্রধান তিন টার্মিনালে গত দুই দিন নোঙর করেনি নতুন জাহাজ। অথচ প্রতিদিন পাঁচ হাজার পণ্যভর্তি কনটেইনার খালাস হয় যে বন্দরে। মোট কথা বন্দরজুড়ে সুনসান নিরবতা।
শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুল আলম জুয়েল বলেন, গত ১৯ বছরে যে বন্দর এক দিনের জন্য বন্ধ হয়নি; নির্বাচন ও রমজানের আগ মুহূর্তে এমন ধর্মঘট নজিরবিহীন।
বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি ও এশিয়ান অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ সালাম বলেন, টানা পাঁচ দিন চলমান কর্মসূচি এরই মধ্যে আমাদের বড় ক্ষতির মুখে ফেলেছে। প্রতিদিনের ক্ষতি ছাড়িয়ে যাচ্ছে হাজার কোটি টাকা। রপ্তানি পণ্য ক্রেতার কাছে সময়মতো পৌঁছাতে না পারলে অপূরণীয় ক্ষতি হবে। অচলাবস্থা দূর করতে সরকার থেকে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা।
আমদানি ও রপ্তানিকারকরা বলছেন, অচলাবস্থা নিরসনে নৌ মন্ত্রণালয় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অপূরণীয় ক্ষতির মুখোমুখি হবে বন্দর ব্যবহারকারী ২০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান। বন্দর, এনবিআর, ডিপো, শিপিং এজেন্ট, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স, সিঅ্যান্ডএফ, বার্থ অপারেটর, পোশাক মালিক, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিকদেরই প্রতিদিন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতি হচ্ছে হাজার কোটি টাকা।
জানা গেছে, ৩১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা কর্মবিরতি পালন করে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। তবে মঙ্গলবার থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি পালন করছে তারা। সর্বশেষ ২০০৭ সালে শ্রমিক-কর্মচারীরা এমন লাগাতার কর্মসূচি দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর অচল করে দিয়েছিল। সেবার নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কর্মসূচি দিলেও এবার বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বন্দরের এনসিটি টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করছে তারা।
অর্থনীতিতে ব্যাপক ক্ষতি
গত বছরও চট্টগ্রাম বন্দর আয় করেছে ৫ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা। এ হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ১৫ কোটি টাকা আয় করে এই সমুদ্রবন্দর। পণ্য শুল্কায়ন করে বছরে গড়ে ৭০ হাজার কোটি টাকা আয় করে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। প্রতিদিন তাদের রাজস্ব আদায় হয় গড়ে ১৯০ কোটি টাকা। পাঁচ দিন ধরে চলা কর্মবিরতির কারণে তাদের এই আয় কমেছে ৭০ শতাংশের বেশি।
সাগরে ভাসছে শতাধিক বড় জাহাজ
এসব জাহাজ একদিন অলস বসে থাকলে শিপিং এজেন্টকে প্রতিটি জাহাজে ক্ষতিপূরণ গুনতে হয় গড়ে ২০ থেকে ২২ লাখ টাকা। জেটিতে জাহাজ আসা-যাওয়ার প্রক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ থাকায় শিপিং এজেন্টদের সার্বিক কার্যক্রম কমেছে ৮০ শতাংশ। বিদেশি বায়ারের কাছে পণ্য সময়মতো নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে ফ্রেইট ফরোয়ার্ডাররা। তাদের কার্যক্রম কমেছে গড়ে ৭০ শতাংশ। প্রতিদিন গড়ে আট কোটি টাকা আয় করা বেসরকারি ২১টি ডিপোর কার্যক্রম সরাসরি সম্পৃক্ত বন্দরের সঙ্গে। সেই কার্যক্রম কমেছে ৯০ শতাংশ।
ডিপো মালিক সমিতির সংগঠন বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন শিকদার বিপ্লব বলেন, ৩১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন আট ঘণ্টার কর্মবিরতি ছিল। সেই সময় শেষ হওয়ার পর আমরা কাজ করার জন্য কিছুটা সময় পেতাম। মঙ্গলবার থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু হওয়ায় সবকিছু স্থবির।
খালাস হচ্ছে না একটি কনটেইনারও
বন্দর থেকে ৬৭ ধরনের পণ্য ডিপোতে এনে খালাস করেন আমদানিকারকরা। আবার রপ্তানি পণ্যের শতভাগ পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা শুল্কায়ন হয় ডিপোতে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। বন্দরের জেটি থেকে প্রতিদিন গড়ে যে পাঁচ হাজার পণ্যভর্তি কনটেইনার খালাস করা হয়, সেটিরও শুল্কায়ন প্রক্রিয়া তদারক করে কাস্টম কর্তৃপক্ষ। টানা কর্মবিরতির কারণে প্রথম তিন দিনে তাদের এ কাজে ব্যাঘাত ঘটলেও এখন পুরোপুরি এ কার্যক্রম স্থবির। মঙ্গলবার অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু হওয়ার পর একটি কনটেইনারও খালাস হয়নি। জাহাজ থেকেও কনটেইনার ওঠানো-নামানো যাচ্ছে না।
জেটিতে নোঙর করতে পারছে না জাহাজ
আমদানি পণ্য নিয়ে বন্দরসীমায় এখন জাহাজ আছে শতাধিক। এর বেশির ভাগ লাইটার জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস করবে। যেসব জাহাজ জেটিতে নোঙর করবে তার বেশির ভাগ আসার কথা বন্দরের প্রধান তিনটি টার্মিনাল জিসিবি, সিসিটি ও এনসিটিতে। আমদানি-রপ্তানি হওয়া মোট কনটেইনারের গড়ে ৯৭ শতাংশ এই তিন টার্মিনালে ওঠানো-নামানো হয়। এই তিনটি টার্মিনালের সব জেটিতে কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ আছে। ১১টি জাহাজ জেটিতে দাঁড়িয়ে আছে দুই দিন। নতুন কোনো জাহাজ এখানে নোঙর করতে পারছে না। আবার পণ্য খালাস শেষ হলেও কোনো জাহাজ জেটি ছাড়তে পারছে না। বন্দর চ্যানেল সরু হওয়ায় বিদেশি বড় জাহাজকে বন্দর ছাড়তে সহায়তা করে নিজস্ব পাইলটরা। তারা কাজে যোগ না দেওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে জাহাজ চলাচলের পুরো কার্যক্রম।
কনটেইনার জমেছে ৩৭ হাজার
ধর্মঘটের কারণে রপ্তানি কনটেইনারের সংখ্যা ডিপোগুলোতে ক্রমশ বাড়ছে। গত ৩০ জানুয়ারি ২১টি ডিপোতে কনটেইনার ছিল ৮ হাজার ১৭। গতকাল সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৫০। বন্দর জেটিতেও বাড়ছে কনটেইনার। ৩০ জানুয়ারি সেখানে কনটেইনার ছিল ৩৫ হাজার ৩৪২। গতকাল রাত ৮টা পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৯০০তে।
যা বলছেন আন্দোলনকারীরা
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির যে প্রক্রিয়া চলছে, সেটি বাতিল করার উদ্যোগ এখনও নেয়নি সরকার। উল্টো নৌ উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন, বিডার নির্বাহী পরিচালক আশিক চৌধুরী ও বন্দর চেয়ারম্যান এসএম মনিরুজ্জামান এই প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে মূল্যায়ন কমিটি থেকে জোর করে সই আদায় করেছেন। অন্যায়ভাবে আন্দোলন দমানোর চেষ্টা করছেন। গণহারে বদলি করছেন। তাদের অপসারণ করে আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় এ কর্মবিরতি চলতেই থাকবে। আন্দোলন আরও কঠোর হবে।
আরেক সমন্বয়ক হুমায়ুন কবীর বলেন, উচ্চ আদালত আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত চুক্তি না করতে গতকাল সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন। এর পরও কোনো কিছু মানছে না তারা। এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে আমরা আরও কঠোর কর্মসূচি দেব।
আন্দোলনকারীদের সাথে ব্যবসায়ীদের বুধবার রাতে চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদে একটি হোটেলে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে এ বৈঠক হয়। সরকারের কাছে এ বার্তা পৌঁছে দিতে ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করেন তারা। বিষয়টি সরকারকে অবহিত করার আশ্বাস দিয়ে ব্যবসায়ীরা লাগাতার কর্মবিরতি প্রত্যাহারের পাল্টা অনুরোধ জানান।
বৈঠক শেষে বন্দর ব্যবহারকারীদের পক্ষে এম এ সালাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘সামনে নির্বাচন ও তিন দিনের ছুটি রয়েছে। এর পর পরই শুরু হবে রমজান। রমজানের পণ্য কীভাবে সরবরাহ হবে– এ নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। কারণ ফেব্রুয়ারিতে পোশাক খাতে কাজের দিন থাকবে মাত্র ১৮ দিন। মার্চে থাকবে ১৬ থেকে ১৭ দিন। এ অবস্থায় বন্দর অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকলে বর্তমানে থাকা পণ্য যেমন সরবরাহ করা যাবে না, তেমনি নতুন পণ্যও আসবে না। এতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বে উৎপাদন খাত, পাশাপাশি রমজানের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভোক্তারাও।’
এম এ সালাম আরও বলেন, এনসিটি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। শ্রমিকদের বদলি করাসহ শাস্তিমূলক যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেটাও যথাযথ প্রক্রিয়ায় হয়নি। আলোচনা ছাড়া কোনো সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। এনসিটি বিষয়ে বৃহত্তর পরিসরে আলোচনা শুরু করতে সম্মত হয়েছেন আন্দোলনকারীরা। আমরা মনে করি আলোচনার মাধ্যমেই এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। এটা খুব বড় কোনো সমস্যা নয়। সমঝোতার কোনো বিকল্প নেই বলে জানান ব্যবসায়ী এই নেতা।
চাটগাঁ নিউজ/এসএ
আরও খবর পড়ুন – চাটগাঁ নিউজ হোমপেজ
![]()
লাইভ আপডেটেড ভিডিও নিউজ দেখতে চোখ রাখুন সিপ্লাস টিভির ইউটিউব চ্যানেলে






