নগর বিএনপি : লন্ডন থেকে চাপিয়ে দেয়া কমিটি দেখে ‘হতাশ’ তৃণমূল

শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক : নগর কমিটির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক একাধিকবার বহিস্কৃত এরশাদ উল্লাহকে আহ্বায়ক এবং সাবেক ছাত্রদল নেতা সরকার বিরোধী আন্দোলনে নিষ্ক্রিয় নাজিমুর রহমানকে সদস্য সচিব করে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির ২ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে।

নেতাকর্মীদের মতে, এটি লন্ডন থেকে নাজিল হওয়া কমিটি। এই কমিটির আকার এবং কমিটির দুই নেতার নাম দেখে হতাশ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। এই কমিটি ঘোষণা পরপরই নেতাকর্মীদের মাঝে চরম হতাশা নেমে এসেছে। নতুন কমিটিকে অভিনন্দন জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোন বার্তা নেই। তবে বহিস্কারের ভয়ে নেতারা মুখ না খুললেও কর্মী সমর্থকদের অনেকে সমালোচনা করছেন কেন্দ্রিয় নেতাদের। তারা বলছেন, মহানগর বিএনপির ইতিহাসে এমন অযোগ্য লোকের নেতৃত্ব আর হয়নি। নতুন নেতৃত্বে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা অন্দোলন করবে কিনা সেটা এখন দেখার বিষয়।

রবিবার (৭ জুলাই) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবীর রিজভী স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে কমিটির কথা জানানোর পর আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়।

অনেক নেতাকর্মী বলছেন, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপিতে শাহাদাত-বক্করের বিকল্প তৈরি হয়নি এখনো। রাজপথের জন্য ডা. শাহাদাতের মতো নেতার প্রয়োজন। কারণ তাদের এই কমিটিই একমাত্র কোন ধরণের গ্রুপিংয়ে ছিলেন না। শাহাদাত বক্কর নিজেরা মিলে মিশে বিএনপিকে চাঙ্গা রেখেছেন।

নেতাকর্মীদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন,‘যাদের অস্তিত্ব মহানগরের কোনো প্রোগ্রামেই থাকে না তারা কিভাবে আগামীর মহানগর চালাবে?

তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতামতের তোয়াক্কা না করে লন্ডন থেকে চাপিয়ে দেয়া এই কমিটি চট্টগ্রামের মত বৃহত্তর শহরে আওয়ামী লীগ তথা সরকার বিরোধী আন্দোলনে কতটুকু ভুমিকা রাখতে পারবে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাছাড়া দল চালাতে অর্থের প্রয়োজন। নাজিমুর রহমানের কাছে সে রকম কোন আয় নেই। এরশাদ উল্লাহর অর্থবিত্ত থাকলেও তিনি তা খরচ করতে কৃপণতা দেখান। তিনি কিভাবে নগর বিএনপি চালাবেন! এমন প্রশ্নও তুলেছেন নেতারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগর বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতার মনে করছেন তারেক রহমানের এমন অসাংগঠনিক সিদ্ধান্ত দলের জন্য মারাত্মক ক্ষতি বয়ে আনবে।

নাম প্রকাশ করা যাবে না এমন শর্তে নগর বিএনপির আরেক নেতা বলেন, ‘তৃণমূল থেকে শুরু করে বিএনপির অনেক নেতাই এ কমিটি নিয়ে খুশি নন। যেখানে একটা কমিটি দিলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অভিনন্দনের বন্যায় ভেসে যায়। কিন্তু এ কমিটি নিয়ে তেমন একটা শোরগোল নেই। ফেসবুকজুড়েও ছিল না অভিনন্দনের কোনো বার্তা। এছাড়া, এ কমিটিতে যারা দায়িত্ব পেয়েছেন তারা তেমন একটা এক্টিভ ছিলেন না। যে কারণে সবাই হতাশ।’ দায়িত্বপ্রাপ্তরাও বুঝে গেছেন নেতাকর্মীরা তাদের গ্রহণ করেনি, তাই কমিটি ঘোষণার ৩ দিন আহ্বায়ক সদস্য সচিব নাসিমন ভবনের কার্যালয়েও যাননি।

পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে স্থান পেতে পারেন বা পদ প্রত্যাশী এমন নেতারা বহিস্কারের ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না। তারা বলছেন, দলের হাইকমান্ড যা ভালো মনে করেছেন তাই করেছেন।

কমিটি নিয়ে জানতে চাইলে নগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুস সাত্তার বলেন, ‘আমাদের দল চলছে। কমিটি পরিবর্তন হবে এটি একটা প্রক্রিয়া। দল সামনে সুসংগঠিত হবে। কারণ কোনো ব্যক্তি বিএনপির জন্য অপরিহার্য না। একমাত্র খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান যাকে নেতা বানাবেন সেই নেতা। যেই কমিটি হয়েছে, আশা করছি- তারা সঠিকভাবে দায়িত্বপালন করবেন। তাদের সফলতা কামনা করছি।’

মহানগর বিএনপি সূত্রে জানা যায়, এরশাদ উল্লাহকে ২০১২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি দলের ভেতর কোন্দল, সংঘাত এবং বিদ্বেষ সৃষ্টি করে দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কার্যকলাপে লিপ্ত থাকায় বহিষ্কার করা হয়েছিল। একই বছরের ১২ মার্চ ‘ঢাকা চলো’ কর্মসূচির প্রচারণার অংশ নিলে বোয়ালখালী উপজেলার ফুলতলায় বিএনপির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মোরশেদ খানের গাড়ি ভাংচুর করে এরশাদ উল্লাহর সমর্থকরা। ওই গাড়িতে দলের তৎকালীন স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ারও ছিলেন।

এছাড়াও ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হরতালের সময় নগরের চান্দগাঁও থানা এলাকায় পিকেটিং করার সময় তৎকালীন চান্দগাঁও ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি মোশারফ উদ্দীন, সহ-সভাপতি ফরমান রেজা লিটন ও তৎকালীন নগর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বিজিএমইএ নেতা এরশাদ উল্লাহকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। বিজিএমইএ’র নেতাদের অনুরোধে এরশাদ উল্লাহ জীবনে রাজনীতি করবে না বলে মুচলেকা দিয়ে থানা থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন। মোশারফ উদ্দীন ও ফরমান রেজা লিটন দীর্ঘদিন কারাবাসে থেকে মুক্তি পান। এছাড়া এরশাদ উল্লাহ জীবনে ছাত্রদল ও যুবদল এবং বিএনপির অঙ্গ সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। ১৯৯৪ সালের মীর নাছির উদ্দীন ও গোলাম দস্তগীর নগর বিএনপির কমিটিতে তৎকালীন প্রভাবশালী বিএনপি নেতা মোরশেদ খানের অনুরোধে সরাসরি যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক পদ পেয়েছিলেন।

এসব বিষয়ে কথা বলতে সদ্য ঘোষিত নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ ও সদস্য সচিব নাজিমুর রহমানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাঁরা সাড়া দেননি।

উল্লেখ্য, গত ১৩ জুন চট্টগ্রাম নগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। এর আগে, ২০২০ সালের ২৩ ডিসেম্বর ডা. শাহাদাত হোসেনকে আহ্বায়ক ও আবুল হাশেম বক্করকে সদস্য সচিব করে ৩৯ সদস্যের এই কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির নেতৃবৃন্দকে দ্রুততম সময়ে নগরের থানা ও ওয়ার্ড কমিটি পুনর্গঠনের নির্দেশনা দেয় কেন্দ্র। কিন্তু কয়েক দফা উদ্যোগ নিলেও তা সম্ভব হয়নি। ২০২১ সালের অক্টোবরে পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার শেষ পর্যায়ে এসে কেন্দ্রের নির্দেশে তা স্থগিত করা হয়।

এর আগে, ২০১৬ সালের ৬ আগস্ট ডা. শাহাদাতকে সভাপতি ও আবুল হাশেম বক্করকে সাধারণ সম্পাদক করে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়, যা পরের বছর ১০ জুলাই ২৭৫ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হয়।

এছাড়া ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সভাপতি এবং ডা. শাহাদাত হোসেন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন নগর বিএনপির।

চাটগাঁ নিউজ/এসআইএস/এসএ

Scroll to Top