ক্রীড়া ডেস্ক: বিশ্বকাপের এই সেমিফাইনালকে আগেভাগেই ‘ফাইনালের আগে ফাইনাল’ বলেছিলেন অনেকেই! কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে সেই প্রত্যাশিত সমতা দেখা যায়নি। বরং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিজেদের পরিকল্পনায় অটল থেকে স্পেন ২-০ গোলে হারিয়েছে আরেক ফেভারিট ফ্রান্সকে।
আজ বুধবার ডালাসে এই জয়ের মধ্য দিয়ে ১৬ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। একই সঙ্গে এক ম্যাচে গড়েছে একাধিক রেকর্ড, যা এই জয়কে আরও স্মরণীয় করে তুলেছে!
ম্যাচের আগে স্পেনের আত্মবিশ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রতিপক্ষে কিলিয়ান এমবাপে, উসমান দেম্বেলের মতো বিশ্বমানের তারকা থাকলেও স্প্যানিশ শিবিরে ছিল না কোনো বাড়তি চাপ। বড় আসরে এর আগে ফ্রান্সকে হারানোর অভিজ্ঞতা থেকেই আত্মবিশ্বাস পেয়েছিল তারা। মাঠে সেই আত্মবিশ্বাসই ফুটে ওঠে। বলের নিয়ন্ত্রণ, পাসিংয়ের ছন্দ এবং আক্রমণে ধৈর্য-সব মিলিয়ে পুরো ম্যাচে স্পেনই ছিল এগিয়ে।
পুরো ম্যাচে ফ্রান্সের আক্রমণ ছিল এলোমেলো, দিশেহারা। এমবাপেরা নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দ খুঁজে পাননি, আর স্পেনের রক্ষণ তাদের লক্ষ্যভেদী শটের সুযোগও প্রায় দেয়নি।
স্পেনের পরিকল্পনা ছিল পরিষ্কার-বল দখলে রাখা, মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করা এবং দ্রুত আক্রমণে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা। সেই পরিকল্পনার সামনে এমবাপে, উসমান দেম্বেলে ও মাইকেল ওলিসেকে নিয়ে সাজানো ফ্রান্সের আক্রমণভাগ কার্যত হয়ে পড়ে নিষ্প্রভ!
প্রথম গোল আসে ২২ মিনিটে। কর্নার থেকে আসা বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে লামিনে ইয়ামালকে বক্সের ভেতরে ফাউল করেন লুকা দিনিয়ে। রেফারি পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন এবং ভিডিও সহকারী রেফারিও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। স্পটকিক থেকে কোনো ভুল করেননি মিকেল ওইয়ারসাবাল। এই গোলে বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা দাঁড়ায় পাঁচে। এর মাধ্যমে ১৯৮৬ সালে এমিলিও বুত্রাগেনিও এবং ২০১০ সালে ডেভিড ভিয়ার পর স্পেনের হয়ে এক আসরে পাঁচ গোল করা মাত্র তৃতীয় ফুটবলার হিসেবে নাম লেখান তিনি। একই সঙ্গে বিশ্বকাপ ইতিহাসে ফ্রান্সের বিপক্ষে এটি ছিল ১৬তম পেনাল্টি থেকে হজম করা গোল, যা যেকোনো দলের বিপক্ষে সর্বোচ্চ!
গোলের পরও আক্রমণাত্মক তাড়াহুড়ো করেনি স্পেন। বরং বলের দখল ধরে রেখে ম্যাচের গতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। ফ্রান্স সমতা ফেরানোর চেষ্টা করলেও তাদের আক্রমণে ছিল না ধার। প্রথমার্ধের শেষদিকে গোলরক্ষক মাইক ম্যানিয়াঁর ভুল পাস থেকে ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগও তৈরি করেছিল স্পেন। দানি ওলমো ও ইয়ামালের দারুণ সমন্বয়ের পর শেষ মুহূর্তে ডিফেন্ডারের বাধায় বেঁচে যায় ফ্রান্স। এরই মধ্যে চোটের কারণে মাঠ ছাড়েন উইলিয়াম সালিবা, যা ফরাসি রক্ষণকে আরও দুর্বল করে তোলে।
প্রথম ৪৫ মিনিটের পরিসংখ্যানও স্পেনের আধিপত্যের সাক্ষী। ফ্রান্স দুটি শট নিলেও এমবাপে প্রতিপক্ষের বক্সে বল স্পর্শ করতে পেরেছিলেন মাত্র একবার এবং দুবার অফসাইডে ধরা পড়েন। স্পেনের সেন্টারব্যাক জুটি আয়মেরিক লাপোর্তে ও পাও কুবার্সি পুরো ম্যাচে ফরাসি অধিনায়ককে কার্যত নিষ্ক্রিয় রেখেছেন।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচে ফেরার আশায় একের পর এক পরিবর্তন আনেন দিদিয়ের দেশম। কোনে, দেজিরে দুয়ে, রায়ান শেরকি ও থিও হার্নান্দেজ মাঠে নামলেও ম্যাচের চিত্র বদলায়নি। বরং ৫৮ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করে স্পেন। দ্রুতগতির আক্রমণে দানি ওলমোর সঙ্গে ওয়ান-টু পাস খেলে বক্সে ঢুকে ডান পায়ের নিখুঁত শটে জাল খুঁজে নেন পেদ্রো পোরো। বিশ্বকাপে এটি তার দ্বিতীয় গোল। একই সঙ্গে ফার্নান্দো হিয়েরোর পর স্পেনের দ্বিতীয় ডিফেন্ডার হিসেবে এক বিশ্বকাপে একাধিক গোল করার কীর্তি গড়েন তিনি।
দুই গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে রাখে স্পেন। অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি না নিয়ে বলের দখল ধরে রেখে সময় পার করে তারা। ইয়ামাল একবার বল জালে জড়ালেও অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হয়। অন্যদিকে এমবাপের একটি শট দারুণভাবে ব্লক করেন মার্ক কুকুরেয়া। পরে দেজিরে দুয়ের সামনে নিজের ভুলও শুধরে নেন গোলরক্ষক উনাই সিমন। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্স আর ম্যাচে ফেরার মতো কোনো সুযোগই তৈরি করতে পারেনি।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে উৎসবে ফেটে পড়ে ডালাসের গ্যালারি! ২০১০ সালের পর আবারও বিশ্বকাপ শিরোপার স্বপ্ন দেখছে স্পেন, আর সেই স্বপ্ন পূরণে এখন তাদের সামনে মাত্র একটি ম্যাচ। তবে এই জয়ের গুরুত্ব শুধু ফাইনালে ওঠাতেই সীমাবদ্ধ নয়। স্পেন ছুঁয়ে ফেলেছে ইতালির ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত থাকার বিশ্বরেকর্ড। পাশাপাশি ইউরো ও বিশ্বকাপ মিলিয়ে টানা আটটি নকআউট ম্যাচ জিতে প্রথম ইউরোপীয় দল হিসেবেও ইতিহাস গড়েছে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা।
রেকর্ড, আধিপত্য আর শিরোপার স্বপ্ন-সবকিছু মিলিয়ে স্পেনের সামনে এখন আর মাত্র এক ধাপের পথ! বিশ্বকাপের স্বপ্নের ফাইনালে তাদের সামনে আর্জেন্টিনা অথবা ইংল্যান্ড।
চাটগাঁ নিউজ/জেএইচ





