রাউজান প্রতিনিধি: চট্টগ্রামের রাউজানে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে গরু চুরির ঘটনা। একের পর এক খামার ও গৃহস্থের গোয়ালঘরে হানা দিয়ে সংঘবদ্ধ চোরচক্র গরু নিয়ে পালিয়ে যাওয়ায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন ক্ষুদ্র খামারি ও গৃহস্থরা। অনেকেই গরু রক্ষায় রাত জেগে পাহারা দিলেও থামছে না চুরির ঘটনা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রায় প্রতিদিন কোথাও না কোথাও গরু চুরির ঘটনা ঘটছে। গভীর রাতে সংঘবদ্ধ চোরচক্র পিকআপ ও ট্রাক নিয়ে এসে প্রথমে আশপাশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। পরে সুযোগ বুঝে খামার ও গোয়ালঘরের তালা ভেঙে গরু নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে চোরেরা খামারিদের গতিবিধিও নজরদারিতে রাখছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের পাঠানপাড়া গ্রামের গৃহস্থ সাদ্দাম হোসেন জানান, ঘরের সীমানা প্রাচীরের ভেতরে গোয়ালঘরে দুটি গরু ছিল। এর মধ্যে একটি গাভী ও অপরটি ষাঁড়। বুধবার ভোর ৪টার দিকে চোরের দল সীমানা প্রাচীর টপকে ভেতরে প্রবেশ করে গোয়ালঘরের তালা ভেঙে ষাঁড়টি নিয়ে যায়। কোরবানির বাজারে বিক্রির জন্য তিনি গরুটি লালন-পালন করেছিলেন। গরুটির ওজন প্রায় পাঁচ মণ।
তিনি বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে একটি পিকআপে করে গরুটি নোয়াপাড়ার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ওই সময় এলাকায় পুলিশের টহল থাকলেও গরু উদ্ধার হয়নি।
এর আগে একই ইউনিয়নের গশ্চি এলাকার অছি মিয়া চেয়ারম্যানের বাড়ির ক্ষুদ্র খামারি মো. মোরশেদ জানান, নিজের সঞ্চয় ও ব্যাংক ঋণ নিয়ে পাঁচটি গরু পালন করছিলেন তিনি। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে বড় আশা ছিল তার। কিন্তু গত শনিবার ভোরে বাড়ির পেছনের গোয়ালঘরের দরজার চেইন কেটে দুটি বড় ষাঁড় চুরি করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। প্রতিটি ষাঁড়ের বাজারমূল্য প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
তিনি বলেন, রাতভর পাহারায় ছিলাম। ভোরের দিকে শরীর খারাপ লাগায় বিশ্রাম নিতে যাই। সকালে গিয়ে দেখি গোয়ালঘরের দরজা খোলা, চেইন নিচে পড়ে আছে, আর দুটি ষাঁড় নেই।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, গত সোমবার থানায় অভিযোগ দিতে গেলে দায়িত্বরত পুলিশ প্রথমে অভিযোগ নিতে অনীহা প্রকাশ করে। পরে আত্মীয়ের সুপারিশে অভিযোগ দায়ের করতে সক্ষম হন।
এর আগে গত ২১ এপ্রিল একই ইউনিয়নের পাঁচখাইন গ্রামের খুইল্যা মিয়ার বাড়ির প্রবাসী আবছারের একটি গাভী ও একটি ষাঁড় চুরি হয়। যার আনুমানিক মূল্য আড়াই লাখ টাকা। পরদিন একই গ্রামের ফজল কন্ট্রাকটরের বাড়ির বাদশা মিয়ার কোরবানির জন্য প্রস্তুত দুটি ষাঁড় চুরি হয়।
গত ১২ এপ্রিল রাতে উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের কালাকাতের পাড়ার আরাফা খাতুনের চারটি গরু চুরি হয়। একই রাতে মাইজপাড়া গ্রামের মো. আলাউদ্দিনের গোয়ালঘর থেকেও দুটি ষাঁড় নিয়ে যায় চোরচক্র।
এ ছাড়া ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে নোয়াজিষপুর ইউনিয়নের নতুনহাট এলাকার করিম সিকদারের বাড়ির মোহাম্মদ রফিক ওরফে ননাই মিয়ার গোয়ালঘরের তালা ভেঙে দুটি উন্নত জাতের ষাঁড় ও গাভী চুরি হয়। চুরি হওয়া গাভী থেকে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ লিটার দুধ পাওয়া যেত, যা বিক্রি করে সংসার চলত বলে জানান তিনি।
২৫ জানুয়ারি রাতে কদলপুরের মো. জামা চৌধুরী বাড়ির গৃহস্থ মো. ইউনুসের বাড়ির উঠানের গোয়ালঘর থেকে পাঁচটি গরু চুরি হয়। স্থানীয়দের দাবি, চলতি বছরে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে একাধিক গরু চুরির ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চুরি হওয়া গরু উদ্ধার হয়নি।
পাহাড়তলী ইউনিয়নের শেখপাড়া গ্রামের আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, আমাদের গোয়ালে ১৫টি গরু রয়েছে। এর মধ্যে সাতটি কোরবানির জন্য পালন করা হয়েছে। চুরি ঠেকাতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। তারপরও আতঙ্ক কাটছে না। এখন গোয়ালের পাশেই রাত কাটাতে হচ্ছে।
খামারিরা জানান, কয়েক বছর ধরে দেশীয় গরুর চাহিদা বাড়ায় উপজেলার অনেক শিক্ষিত বেকার যুবক, প্রবাসফেরত তরুণ ও নিম্ন আয়ের পরিবার ঋণ ও ধারদেনা করে ছোট ছোট খামার গড়ে তুলেছেন। অধিকাংশ খামারি কোরবানির ঈদ সামনে রেখে গরু মোটাতাজাকরণে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু শেষ সময়ে গরু চুরির ঘটনায় তাদের স্বপ্ন ভেঙে পড়েছে।
রাউজান সদর ইউনিয়নের গৃহস্থ মো. আবুল কালাম বলেন, একটি গরু লালন-পালনে বছরের পর বছর পরিশ্রম করতে হয়। চোরেরা কয়েক মিনিটেই সব শেষ করে দিচ্ছে। আমরা এখন আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সংঘবদ্ধ চোরচক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকলেও অধিকাংশ ঘটনায় চুরি হওয়া গরু উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ফলে চোরদের দৌরাত্ম্য আরও বেড়ে গেছে।
এ বিষয়ে রাউজান থানার ওসি (তদন্ত) নিজাম উদ্দিন দেওয়ান বলেন, গরু চুরির ঘটনাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও নির্ধারিত পয়েন্টে পুলিশের চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। রাতে টহলও জোরদার করা হয়েছে। কয়েকটি চক্রকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে এবং খামারিদের সঙ্গে মতবিনিময় করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
চাটগাঁ নিউজ/জয়নাল/এমকেএন





