পা দিয়ে লিখে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেল রাব্বি

চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক : পা দিয়ে লিখে এইচএসসি পরীক্ষায়ও বাজিমাত করেছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দুই হাত হারানো রফিকুল ইসলাম রাব্বি। চট্টগ্রাম সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এবার পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছেন।

পরীক্ষার ফল ঘোষণার পর তার বাবা-মাসহ পাড়া-প্রতিবেশী সবাই আনন্দিত। পুরো পাড়ায় খুশির বন্যা বইছে। তাদের পরিবারে এবার দ্বিগুণ আনন্দ। রাব্বির ছোট বোন রোকাইয়া আক্তার রোজাও ভাটিয়ারী বিজয় স্মরণী কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। সে জিপিএ-৩.৬৭ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে।

রফিকুল ইসলাম রাব্বি ভাটিয়ারী ইউনিয়নের পূর্ব হাসনাবাদ গ্রামের দিনমজুর বজলুর রহমানের ছেলে। তিন ভাইবোনের মধ্যে সে সবার বড়।

কথা প্রসঙ্গে রাব্বি খবরের কাগজকে জানায়, এইচএসসির বিজ্ঞান বিভাগের সিলেবাস অনেক বড়। তাই সে শুরু থেকেই মনোযোগী ছিল। দিনের পড়ালেখা দিনেই শেষ করেছে। এ কারণে ভালো ফল অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে রাব্বি জানান, বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে ব্যবহারিক পরীক্ষা রয়েছে। সেখানে বেশ কিছু আঁকার কাজ আছে। পা দিয়ে আঁকতে তার কোনো সমস্যা হয় না। পা দিয়ে সে ভালো আঁকতে পারে। তাই ব্যবহারিক পরীক্ষাতেও ভালো নম্বর পেয়েছে। শুধু বাংলায় এ গ্রেড এসেছে। বাকি সব বিষয়ে এ প্লাস নম্বর পেয়েছে বলে জানায় রাব্বি।

রাব্বি এসএসসি পরীক্ষাতেও পা দিয়ে লিখে কৃতিত্বের সঙ্গে জিপিএ-৫ অর্জন করেছিল। তার একমাত্র বোন রোকাইয়া আক্তারও তার সঙ্গে এসএসসি পাস করে। এসএসসি পাসের পর রাব্বির স্বপ্ন ছিল একটি সরকারি কলেজে ভর্তি হওয়া। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। সে সরকারি কলেজ থেকে এবার এইচএসসি পাস করেছে। রাব্বির স্বপ্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া।

রাব্বির বাবা বজলুর রহমান মুঠোফোনে জানান, প্রায় ৯ বছর আগে এক দুর্ঘটনায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তার ছেলে দুটি হাত হারায়। এরপর থেকেই তার জীবন কঠিন হয়ে যায়। শুরু হয় অন্যরকম সংগ্রাম। তবে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া, রাব্বি সফলতার সঙ্গে একেকটি ধাপ পার হচ্ছে। আল্লাহ তার মনের আশা পূরণ করবেন।

বজলুর রহমান জানান, একসময় তিনি জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকের কাজ করতেন। দুর্ঘটনায় ছেলের দুটি হাত হারানোর পর তিনি চরম বিপাকে পড়েন। ছেলের চিকিৎসা করাতে গিয়ে জাহাজভাঙা শিল্পের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে খরচ বেড়ে যায়। এ কারণে ঋণের জালে আটকে পড়েন। তাই তিনি ও তার স্ত্রী দৈনিকভিত্তিক শ্রমিকের কাজে নেমে পড়েন। ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ ও সংসার চালান। রাব্বি এবং রোজার সফলতার পেছনে তাদের মায়ের অবদান বেশি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

২০১৮ সালে মুখ দিয়ে লিখে, অর্থাৎ মুখে কলম ধরে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা দিয়েছিল রাব্বি। ওই পরীক্ষায় মুখ দিয়ে লিখে ৪ দশমিক ৮৩ পয়েন্ট পেয়েছিল সে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ধীরে ধীরে পায়ে লেখার অভ্যাস শুরু করে। এরপর থেকে সব শ্রেণিতে পা দিয়ে লিখে পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে সে।

জানা গেছে, রাব্বির জীবনের দুর্ভোগের শুরু ২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর। তখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত সে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ভাটিয়ারী ফুট ওভারব্রিজের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় একটি বৈদ্যুতিক তারে আটকা পড়ে। দুই হাত থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয় তার। স্থানীয় লোকজন রাব্বিকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে যায়।

কয়েক মাসের চিকিৎসায় সুস্থ হলেও কাটা পড়ে শিশুটির হাত দুটি। তবু হাল ছাড়েনি সে। জীবনে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে শুরুতে মুখ দিয়ে লেখার চর্চা শুরু করে রাব্বি। একের পর এক পরীক্ষায় এভাবেই সাফল্য লাভ করে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত মুখ দিয়ে লেখার পর আরও দ্রুতগতি অর্জনের জন্য লিখতে শুরু করে পা দিয়ে। ২০২৪ সালে হাজী তোবারক আলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পা দিয়ে লিখেই এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ লাভ করে। এবার এইচএসসিতেও অর্জন করেছে একই ফল।

চাটগাঁ নিউজ/এসএ

Scroll to Top