নিজস্ব প্রতিবেদক : সাংবাদিকদের আবাসন নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বরাদ্দ দেওয়া ৪০ দশমিক ৬২ কাঠা জমি বিক্রির উদ্যোগে এবার আদালতের নিষেধাজ্ঞা। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক সমবায় সমিতি লিমিটেডের (চমেসাস) নামে বরাদ্দ এই জমি বিক্রির প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বায়নানামায় জমির মূল্য ২৫ কোটি টাকা দেখানো হলেও প্রকৃত বিক্রয়মূল্য ৪৫ কোটি টাকা বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। অন্যদিকে, মাত্র ৫০ হাজার টাকা জমা দিয়ে খোলা একটি ব্যাংক হিসাবে এক বছরের কম সময়ে প্রায় ১৩ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্যও সামনে এসেছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) চট্টগ্রামের পঞ্চম সিনিয়র সিভিল জজ আদালত জমি হস্তান্তর না করার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি বিবাদীদের ১৫ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে সম্পত্তির ওপর স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী খায়েরুন্নেছা আকতার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
আবাসনের জমি, বাস্তবায়ন হয়নি প্রকল্প
সমবায় অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট নথি সূত্রে জানা গেছে, ২০০৬ সালের ২২ অক্টোবর নগরের কল্পলোক আবাসিক এলাকায় চমেসাসকে ৪০ দশমিক ৬২ কাঠা জমি বরাদ্দ দেয় সিডিএ। বরাদ্দপত্রে জমির শ্রেণি উল্লেখ করা হয় ‘ব্লক অ্যাপার্টমেন্ট’। শর্ত ছিল, ভবন নির্মাণ করে সমিতির সদস্যদের মধ্যে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দিতে হবে এবং ভবনের নকশা সিডিএর অনুমোদন নিতে হবে।
কিন্তু দীর্ঘ সময়েও আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে জমি বিক্রির উদ্যোগ নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে সমিতির বর্তমান ব্যবস্থাপনা কমিটির ভূমিকা নিয়ে। সদস্যদের একাংশের অভিযোগ, জমি বিক্রি হলে ফ্ল্যাট পাওয়ার প্রত্যাশা যেমন ভেস্তে যাবে, তেমনি বিক্রির অর্থ কীভাবে ব্যবহার বা বণ্টন করা হবে, তা নিয়েও স্বচ্ছতা নেই।
২৫ কোটি টাকার বায়না, প্রকৃত মূল্য ৪৫ কোটি?
নথি অনুযায়ী, গত ৩ ফেব্রুয়ারি ৬৪৮/২০২৬ নম্বর দলিলে জমি বিক্রির বায়নানামা নিবন্ধন করা হয়। এতে মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে ২৫ কোটি টাকা। তবে জমিটির প্রকৃত বিক্রয়মূল্য ৪৫ কোটি টাকা বলে অভিযোগ রয়েছে। এ হিসাবে ঘোষিত মূল্য ও অভিযোগে উল্লেখিত মূল্যের ব্যবধান ২০ কোটি টাকা।
এই মূল্যবৈষম্যের অভিযোগের সত্যতা, প্রকৃত লেনদেনের অঙ্ক এবং অগ্রিম অর্থের হিসাব এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, জমি বিক্রির অগ্রিম অর্থ এমন একটি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে, যার বিষয়ে সমিতির সদস্যদের পর্যাপ্ত তথ্য দেওয়া হয়নি।
অভিযোগসংশ্লিষ্ট বিবরণী অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের আসকারদিঘী পাড় শাখায় মাত্র ৫০ হাজার টাকা জমা দিয়ে খোলা ওই হিসাবে এক বছরের কম সময়ে প্রায় ১৩ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। তবে এসব অর্থের উৎস, উত্তোলনকারী এবং চূড়ান্ত গন্তব্য সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে লেনদেনের তথ্যের ভিত্তিতে অর্থ আত্মসাৎ বা অবৈধ ব্যবহারের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই; প্রয়োজন ব্যাংক নথি ও সমিতির হিসাবপত্রের নিরপেক্ষ যাচাই।
মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই বিক্রির উদ্যোগের অভিযোগ
জেলা সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয় জানিয়েছে, সমিতির সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন। অথচ জমি বিক্রির অনুমোদন চেয়ে ওই কার্যালয়ে কোনো আবেদন জমা পড়েনি বলে জানিয়েছেন জেলা সমবায় কর্মকর্তা সিফাত উল্লাহ তাসনিম।
গত ২১ সেপ্টেম্বর জমি বিক্রির প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সিডিএ চেয়ারম্যানকে চিঠি দেয় জেলা সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয়। একই বিষয়ে ২০ সেপ্টেম্বর চান্দগাঁও সাবরেজিস্ট্রারের কার্যালয়েও চিঠি দেওয়া হয়। অনুমোদনসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত জমি বিক্রি ও হস্তান্তর বন্ধ রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সমবায় সমিতি আইন, ২০০১-এর ৪৮(২) ধারায় সমিতির কার্যক্রম পরিদর্শনের দায়িত্ব পাওয়া রাঙ্গুনিয়া উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা পার্থ কান্তি বিশ্বাসের প্রাথমিক পরিদর্শনে পাওয়া তথ্য ও নথির ভিত্তিতে এ আপত্তি তোলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এখন প্রশ্ন জবাবদিহির
জমি বিক্রির সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছে, সাধারণ সভার অনুমোদন ছিল কি না, বায়নানামায় প্রকৃত মূল্য কত এবং ব্যাংক হিসাবে লেনদেন হওয়া অর্থ কোথায় গেছে—এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ জবাব চান সমিতির সদস্যদের একাংশ। তাঁদের দাবি, জমি বিক্রি ও অর্থ বণ্টনের পুরো প্রক্রিয়া তদন্ত করে সদস্যদের স্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে।
আদালতের নিষেধাজ্ঞায় আপাতত জমি হস্তান্তরের উদ্যোগ আইনি বাধার মুখে পড়েছে। এখন বরাদ্দের শর্ত, অনুমোদনসংক্রান্ত নথি, বায়নানামার আর্থিক হিসাব এবং ব্যাংক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাংবাদিকদের আবাসনের জন্য বরাদ্দ জমি শেষ পর্যন্ত সদস্যদের আবাসন নিশ্চিত করবে নাকি বিক্রির মাধ্যমে সেই মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে—তার উত্তর নির্ভর করছে তদন্ত, নথিপত্রের যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর জবাবদিহির ওপর।
চাটগাঁ নিউজ/এসএ






