নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রাম-নাজিরহাটের জনপ্রিয় লোকাল ট্রেনসহ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের আরও ছয়টি ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, সেবার মানোন্নয়ন, টিকিট ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং তীব্র জনবল সংকট মোকাবিলাকে এ সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে দেখছে রেল কর্তৃপক্ষ। নতুন ছয়টি যুক্ত হলে পূর্বাঞ্চলে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত ট্রেনের সংখ্যা দাঁড়াবে ১৪ জোড়া।
তবে রেলের এই উদ্যোগকে ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, আউটসোর্সিংয়ের নামে ধীরে ধীরে রেলকে বেসরকারিকরণের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। তাদের দাবি, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় সেবার মান বাড়ার বদলে টিকিট কালোবাজারি, অব্যবস্থাপনা ও যাত্রী হয়রানির অভিযোগই বেশি দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে রেল কর্মকর্তাদের বক্তব্য, জনবল সংকটের কারণে যেখানে নিয়মিত টিকিট পরীক্ষা ও যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা কঠিন, সেখানে বেসরকারি অপারেটররা কঠোরভাবে ভাড়া আদায় করে রাজস্ব বাড়াতে সক্ষম হচ্ছে।
তালিকায় জনপ্রিয় চট্টগ্রাম-নাজিরহাট
নতুন করে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার তালিকায় থাকা ছয়টি ট্রেন হলো—চট্টগ্রাম-নাজিরহাট লোকাল, নরসিংদী কমিউটার, নোয়াখালী এক্সপ্রেস, সমতট এক্সপ্রেস, জয়দেবপুর কমিউটার ও ঝারিয়া লোকাল। ট্রেনগুলো চট্টগ্রাম, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও নোয়াখালী রুটে চলাচল করে।
এর মধ্যে চট্টগ্রাম-নাজিরহাট লোকাল ট্রেনটি এ অঞ্চলের সাধারণ যাত্রীদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কম খরচে চট্টগ্রাম নগরী ও নাজিরহাটের মধ্যে যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম এই ট্রেন। রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার আগে ট্রেনটিকে ‘কমিউটার’ হিসেবে উন্নীত করা হবে।
রেলের যুগ্ম মহাপরিচালক (পরিবহন) মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রাম-নাজিরহাট লোকালসহ ছয়টি ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। খুব শিগগিরই এ বিষয়ে দরপত্র আহ্বান করা হবে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান জানান, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ট্রেনের অভ্যন্তরীণ পরিষেবা, টিকিট যাচাই, পরিচ্ছন্নতা ও যাত্রী ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবে। তবে ট্রেনের মূল পরিচালনা বাংলাদেশ রেলওয়ের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে।
আয় বাড়ার উদাহরণ মহুয়া কমিউটার
রেল কর্মকর্তাদের সবচেয়ে বড় যুক্তি রাজস্ব আয় বৃদ্ধি। তাদের দাবি, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যাওয়ার পর কয়েকটি ট্রেনের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় বাণিজ্যিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার আগে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মহুয়া কমিউটার ট্রেন থেকে রাজস্ব আয় হয়েছিল ৬৮ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে একই ট্রেনের রাজস্ব বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।
রেল কর্মকর্তাদের দাবি, রেলের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত সময়ের তুলনায় বেসরকারিভাবে পরিচালিত ট্রেনগুলোর মাসিক আয় ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। তাদের যুক্তি, বেসরকারি অপারেটরদের আয়ের সঙ্গে সরাসরি পরিচালন দক্ষতা যুক্ত থাকায় টিকিট যাচাই, ভাড়া আদায় ও যাত্রী ব্যবস্থাপনায় তারা বেশি কঠোর। ফলে রাজস্ব ফাঁকি কমানো সম্ভব হচ্ছে।
১০ হাজারের বেশি পদ শূন্য
তবে রেলের এই সিদ্ধান্তের পেছনে থাকা জনবল সংকটের চিত্রও বেশ উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, পূর্বাঞ্চলে অনুমোদিত ২২ হাজার ৩৫৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১১ হাজার ৫২২ জন। শূন্য রয়েছে ১০ হাজার ৮৩৬টি পদ।
অপারেশনাল সাপোর্ট, রক্ষণাবেক্ষণ ও মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতেই জনবল সংকট তীব্র। ফলে অনেক ক্ষেত্রে যথাযথভাবে টিকিট পরীক্ষা করা, যাত্রী ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলের এক কর্মকর্তা বলেন, জনবল স্বল্পতার কারণে অনেক সময় টিকিটবিহীন যাত্রীদের যথাযথভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। এতে রেল রাজস্ব হারায়। বেসরকারি অপারেটররা নিজেদের আয় নিশ্চিত করতে ভাড়া আদায়ে তুলনামূলকভাবে কঠোর হওয়ায় রাজস্ব বাড়ছে।
বেসরকারি ট্রেনেই বেশি অব্যবস্থাপনা
রেল কর্মকর্তাদের এসব যুক্তির সঙ্গে একমত নন শ্রমিক নেতারা। তাদের দাবি, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত ট্রেনগুলোতেই বরং টিকিট কালোবাজারি, যাত্রী হয়রানি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ বেশি।
রেলওয়ে শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ও রেল শ্রমিক ঐক্য জোটের মুখপাত্র এমআর মনজু বলেন, ‘ট্রেন বেসরকারি খাতে দেওয়া মানে রেলকে পঙ্গু করে দেওয়া।’
তার অভিযোগ, গত দুই দশকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে রেলের কোনো দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ হয়নি। বরং টিকিট কালোবাজারি থেকে শুরু করে যাত্রীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ—রেলের নেতিবাচক খবরের বড় একটি অংশ আউটসোর্সিং কর্মীদের ঘিরে।
তার মতে, রেলের জনবল সংকটকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী স্থায়ী জনবল নিয়োগ করলেই এ সংকটের সমাধান সম্ভব।
নতুন বিনিয়োগে আপত্তি নেই শ্রমিকদের
শ্রমিক নেতাদের অবস্থান অবশ্য পুরোপুরি বেসরকারি বিনিয়োগবিরোধী নয়। তারা বলছেন, বেসরকারি বিনিয়োগকারী নতুন ট্রেন এনে পরিচালনা করলে তাতে আপত্তি নেই। আপত্তি হচ্ছে—সরকারি অর্থে পরিচালিত বিদ্যমান ট্রেনগুলোকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া।
তাদের আশঙ্কা, আয়কে প্রধান লক্ষ্য করা হলে সাধারণ যাত্রীর স্বার্থ উপেক্ষিত হতে পারে। বিশেষ করে লোকাল ট্রেনগুলোতে কৃষক, শ্রমিক ও নিম্নআয়ের মানুষের যাতায়াত বেশি হওয়ায় বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ভাড়া বৃদ্ধি বা অন্যান্য খরচ বাড়ার চাপ তৈরি হতে পারে।
প্রশ্ন যাত্রী অধিকারকর্মীদের
রেলওয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন যাত্রী অধিকারকর্মীরাও। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরীর প্রশ্ন—একই যাত্রী, একই ভাড়া ও একই রেলপথ ব্যবহার করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লাভ করতে পারলে বাংলাদেশ রেলওয়ে কেন তা পারবে না?
তার মতে, বেসরকারি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে যদি বিদ্যমান যাত্রী ও ভাড়া থেকেই লাভ করা সম্ভব হয়, তাহলে রেলের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সেই দক্ষতা নিশ্চিত করতে না পারার কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।
তিনি বলেন, সেবার মানোন্নয়নের জন্য সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি ট্রেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া রেলওয়ের দ্বৈত নীতির প্রকাশ। বেসরকারি পরিচালনা সম্প্রসারণের পরিবর্তে রেলের অভ্যন্তরের অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
লাভ বনাম জনসেবা—কোন পথে রেল?
ছয়টি নতুন ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে পূর্বাঞ্চলে এমন ট্রেনের সংখ্যা দাঁড়াবে ১৪ জোড়া। রেল কর্তৃপক্ষের দাবি, এতে জনবল সংকট সামাল দেওয়ার পাশাপাশি টিকিট ব্যবস্থাপনা, যাত্রীসেবা ও রাজস্ব আয় বাড়বে।
অন্যদিকে শ্রমিক ও যাত্রী অধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, এভাবে ধাপে ধাপে সরকারি ট্রেনের ব্যবস্থাপনা বেসরকারি হাতে চলে গেলে রেলের মূল সেবামূলক চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এখন অপেক্ষা রেল ভবনের প্রজ্ঞাপনের। প্রজ্ঞাপন জারির পর দরপত্র আহ্বান করা হবে। এরপরই স্পষ্ট হবে—বেসরকারি ব্যবস্থাপনা সত্যিই রেলের রাজস্ব ও সেবার মান বাড়ায়, নাকি সরকারি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার দায় অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার আরেকটি উদ্যোগ হয়ে দাঁড়ায়।
চাটগাঁ নিউজ/এসএ





