সাংগ্রাইয়ের জলধারায় ধুয়ে গেল গ্লানি, রাঙামাটিতে সম্প্রীতির রঙিন উৎসব

আলমগীর মানিক: পুরোনো বছরের দুঃখ-গ্লানি ধুয়ে নতুনকে বরণ করার আনন্দে মুখর হয়ে উঠেছে রাঙামাটি। পাহাড়জুড়ে এখনো বইছে উৎসবের আবহ, আর সেই আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে মারমা জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী সামাজিক উৎসব সাংগ্রাই।

শুক্রবার সকালে চিং হ্লা মং চৌধুরী মারী স্টেডিয়াম-এ মারমা সংস্কৃতি সংস্থার আয়োজনে দিনব্যাপী এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভা শেষে অতিথিরা একে অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে ‘সাংগ্রাই মৈত্রী জল উৎসব’-এর উদ্বোধন করেন।

উৎসবের মূল আকর্ষণ ছিল ‘সাংগ্রাই রিলং পোয়ে’। দুই সারিতে দাঁড়িয়ে তরুণ-তরুণীরা একে অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে প্রতীকীভাবে পুরোনো বছরের ক্লান্তি ও বিষাদ ঝেড়ে ফেলেন। আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠা এই জলকেলিতে যেন প্রাণ ফিরে পায় পাহাড়ি সংস্কৃতি।

মারমা সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, এই পবিত্র জল শুধু শরীর নয়, মনকেও শুদ্ধ করে। এটি নতুন বছরের জন্য শুভকামনা ও ইতিবাচকতার প্রতীক। তাই সাংগ্রাই শুধু আনন্দের নয়, বরং গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্যপূর্ণ একটি উৎসব— যেখানে অতীতের কষ্ট ভুলে সম্প্রীতি, শান্তি ও সহমর্মিতার বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।

দিনভর সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় ঐতিহ্যবাহী গান ও নাচে মুখর ছিল পুরো স্টেডিয়াম এলাকা। উৎসবে অংশ নেওয়া তরুণী নবনীতা মারমা বলেন, “সারা বছর আমরা এই দিনের অপেক্ষায় থাকি। পানি ছিটিয়ে আমরা একে অপরের মঙ্গল কামনা করি।”

এ উৎসবকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকদের ঢল নামে রাঙামাটিতে। অনেকেই স্থানীয়দের সঙ্গে জলকেলিতে অংশ নেন এবং স্মরণীয় মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করেন। পর্যটক সুভাষ বাসনা দম্পতি বলেন, “এমন উৎসব আগে দেখিনি। পাহাড়ের মানুষের আনন্দ ভাগাভাগির এই সংস্কৃতি সত্যিই মুগ্ধকর।”

আয়োজক কমিটির সভাপতি পাইচিমং মারমা জানান, সাংগ্রাই শুধু একটি উৎসব নয়—এটি মারমা জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় ও ঐক্যের প্রতীক। নতুন প্রজন্মের কাছে নিজেদের ঐতিহ্য তুলে ধরাই এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দীপেন দেওয়ান এবং প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। তারা পাহাড়ের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির প্রশংসা করেন এবং সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

দিনশেষে বর্ণিল এই জল উৎসব যেন একটাই বার্তা দিয়ে যায়—যেভাবে পানির ছোঁয়ায় ধুলো মুছে যায়, ঠিক তেমনি মানুষের মন থেকেও মুছে যাক সব বিভেদ; গড়ে উঠুক এক অসাম্প্রদায়িক, সৌহার্দ্যপূর্ণ বাংলাদেশ।

চাটগাঁ নিউজ/জেএইচ

Scroll to Top