নয় দেশে ‘১১২২ ফ্ল্যাট-বাড়ি’ সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামানের

চাটগাঁ নিউজ ডেস্ক : সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার পরিবারের নামে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়াসহ বিশ্বের নয়টি দেশে ১১২২টি ফ্ল্যাট, প্লট ও বাড়ির সন্ধান পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বাংলাদেশি টাকায় এসব সম্পদের আনুমানিক মূল্য প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা।

জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি সম্পদ যুক্তরাজ্যে— সেখানে ৮০৬টি স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে। এছাড়া কম্বোডিয়ায় ১১৬টি, দুবাইতে ৭৩টি, মালয়েশিয়ায় ৪৭টি, যুক্তরাষ্ট্রে ৪১টি, থাইল্যান্ডে ২৪টি, ভারতে ১১টি, ভিয়েতনামে ৪টি এবং ফিলিপাইনে ২টি সম্পদ মিলেছে। এসব সম্পদের অধিকাংশই ফ্ল্যাট, তবে কিছু প্লট ও বাড়িও রয়েছে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, এসব সম্পদের সুনির্দিষ্ট তথ্য পেতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে ১২টি মিউচ্যুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানো হয়েছে। তবে, এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি দেশ থেকে জবাব মিলেছে। দুদক এই সম্পদ উদ্ধারে আইনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও দুবাইতে বাংলাদেশের আদালতের ৬টি ক্রোক আদেশ পাঠানো হয়েছে। তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে, আইনি প্রক্রিয়ার ধীরগতির সুযোগ নিয়ে সাইফুজ্জামান কিছু সম্পদ বিক্রি করে অর্থ দুবাইতে পাচার করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামানের দুর্নীতির বিষয়ে দুদক ইতোমধ্যে ৩০টি মামলা দায়ের করেছে। আরও ডজনখানেক মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। তবে, বর্তমানে কমিশনে কমিশনার না থাকায় অনুসন্ধান ও তদন্তকাজ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে থাকা তথ্যমতে সাইফুজ্জামান বর্তমানে দুবাইতে রাজকীয় জীবনযাপন করছেন। সেখানে বসে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সম্পদ বিক্রি করে অর্থ দুবাইতে পাচার করে আনছেন। দুবাই বর্তমানে কালোবাজারের জন্য স্বর্গরাজ্য। সাইফুজ্জামান একদিকে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ঋণ নিয়েছেন, অন্যদিকে হুন্ডির মাধ্যমে সেই অর্থ বিভিন্ন দেশে পাচার করেছেন।’

চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, “ভেবে দেখুন, সাইফুজ্জামান বাংলাদেশের সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী ছিলেন, অথচ তিনি ২০১২ সাল থেকেই ভারতের নাগরিক। আমরা ‘ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন অথরিটি অব ইন্ডিয়া’ কর্তৃক তার নামে ইস্যু করা আধার কার্ডের প্রমাণ উদ্ধার করেছি। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দুদক অভিযান চালিয়ে তার দুর্নীতি সংশ্লিষ্ট ২৩ বস্তা কাগজপত্র উদ্ধার করে। সেখানে ভারতে ক্রয় করা সম্পদ ও আধার কার্ড সংশ্লিষ্ট বিস্তারিত তথ্য মিলেছে। অর্থাৎ, সম্পদ পাচারের শুরুটা তিনি ভারত থেকেই করেছিলেন। যদিও ভারতে থাকা সম্পদ তিনি বিক্রি করে দিয়েছেন বলে জানতে পেরেছি। আমরা আমাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”

অন্যদিকে, দুদক মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন বলেন, ‘দুদকের নেতৃত্বে সিআইডি ও এনবিআরসহ ৯ সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত একটি টাস্কফোর্স কঠোর পরিশ্রম করছে। ইতোমধ্যে ৩০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং আরও মামলা প্রক্রিয়াধীন। বিদেশি সম্পদের বিষয়ে আদালতের আদেশক্রমে ক্রোকাদেশ সংশ্লিষ্ট দেশে পাঠানো হয়েছে, পাশাপাশি এমএলএআর-ও পাঠানো হয়েছে। দুদক আইন ও বিধি অনুসরণ করে তার করণীয় সব কাজ করছে, যা এখনও চলমান।’

নয় দেশে সম্পদের পাহাড়

দুদকের তথ্যমতে, সাইফুজ্জামান চৌধুরী সবচেয়ে বেশি সম্পদ গড়েছেন যুক্তরাজ্যে। সেখানে ৮০৪টি ফ্ল্যাট বা বাড়ির খোঁজ পাওয়া গেছে, যার বাংলাদেশি টাকায় মূল্য ৮৫১০ কোটি টাকা। সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কম্বোডিয়া, যেখানে ১১১টি ফ্ল্যাট ও প্লটের তথ্য মিলেছে, যার দাম প্রায় ৩৮০ কোটি টাকা।

এছাড়া দুবাইতে ৭৩টি ফ্ল্যাট-বাড়ির দাম ৭৬১ কোটি টাকা, যুক্তরাষ্ট্রে ৪১টি ফ্ল্যাট-বাড়ির দাম ৫৬০ কোটি টাকা, মালয়েশিয়ায় ৪৭টির দাম ৩১৩ কোটি টাকা এবং থাইল্যান্ডে ২৪টির দাম ১৯০ কোটি টাকা। ভিয়েতনামে কেনা ৪টি ফ্ল্যাট-বাড়ির দাম ১৫৯ কোটি টাকা, ভারতে ১১টির দাম ১৩ কোটি টাকা এবং ফিলিপাইনে ২টি সম্পদের দাম ৮ কোটি টাকা বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বৈশ্বিক সম্পত্তি নিয়ে ‘দ্য মিনিস্টার্স মিলিয়নস’ শিরোনামের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের সম্পত্তির তথ্য প্রকাশ করেছিল, যেখানে শুধুমাত্র যুক্তরাজ্যেই তার ৩৬০টি বাড়ির তথ্য ছিল।

সাইফুজ্জামান সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে মামলার বিবরণ

অনুসন্ধানের শুরুতে দুদক, সিআইডি ও এনবিআরের সমন্বয়ে ৭ সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করা হলেও পরে তা পুনর্গঠন করা হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর দুদকের উপপরিচালক মো. মশিউর রহমানের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের টিম অনুসন্ধান ও তদন্ত কাজ পরিচালনা করছে।

দায়ের করা মামলাগুলোর বিবরণে জানা যায়, সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্টরা পরস্পর যোগসাজশে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে নামসর্বস্ব কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এর মধ্যে ইমিনেন্ট ট্রেডার্সের নামে ২০ কোটি টাকা, ভিশন ট্রেডিং কর্তৃক ২৫ কোটি, রিলায়েবল ট্রেডিংয়ের নামে ১৫ কোটি, প্রোগ্রেসিভ ট্রেডিংয়ের নামে ২৩ কোটি, ক্রিসেন্ট ট্রেডার্সের নামে ২৫ কোটি এবং মডেল ট্রেডিংয়ের নামে ২১ কোটি টাকাসহ মোট ১২৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ৬টি মামলা দায়ের করে দুদক। এসব মামলায় সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তার স্ত্রী ও ইউসিবি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান রুকমীলা জামান, প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের অর্ধশত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আসামি করা হয়েছে।

একইভাবে, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আরও ৫টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে প্রিন্সিপাল শাখার গ্রাহক থার্মেক্স নিট ইয়ার্ন লিমিটেড থেকে ৫২ কোটি টাকা, আগ্রাবাদ শাখার গ্রাহক এইচ এম শিপ ব্রেকিং ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে ৫৫ কোটি, জুবিলী রোড শাখার গ্রাহক ওয়েল মার্ট লিমিটেড থেকে ৫ কোটি টাকা, মহাখালী শাখার গ্রাহক সাইফ পাওয়ারটেক ও ই-ইঞ্জিনিয়ারিং পিএলসি থেকে ৪১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং ইউসিবিএল ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখার গ্রাহক আইকনএক্স সার্ভিস লিমিটেড থেকে ৬০ কোটি টাকাসহ মোট ২১৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী এবং তার স্ত্রী রুকমীলা জামান এসব মামলার প্রধান আসামি।

এছাড়া, চকবাজার, পোর্ট, পাহাড়তলী ও বহদ্দারহাট শাখা হতে ৩১ কোটি ৬৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা আত্মসাতের দায়ে ৪টি মামলা; ৫৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা আত্মসাতের দায়ে ৮টি মামলা এবং ৪৬ কোটি ৭৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ৭টি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিরা হলেন— সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ভাই ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবিএল) সাবেক পরিচালক বশির আহমেদ, অন্য ভাই ও সাবেক পরিচালক আনিসুজ্জামান চৌধুরী ওরফে রনি, সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান বজল আহমেদ বাবুল, সাবেক পরিচালক এম এ সবুর, হাজী ইউনুছ আহমদ, নুরুল ইসলাম চৌধুরী, সাবেক পরিচালক আসিফুজ্জামান চৌধুরী এবং রোকসানা জামান চৌধুরী।

সম্পদ ক্রোক ও ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ

২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে আদালতের আদেশে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আটটি দেশে থাকা ৩৩০টি বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট জব্দ করা হয়। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রে তার নামে থাকা দুটি কোম্পানিতে করা বিনিয়োগ অবরুদ্ধের আদেশও দেওয়া হয়। এসব সম্পদ ও বিনিয়োগের মোট পরিমাণ প্রায় ২৩২০ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে তার জেডটিএস প্রোপার্টিজ ও তানয়ীম প্রোপার্টিজে করা বিনিয়োগ রয়েছে, যেখানে শুধুমাত্র তানয়ীম প্রোপার্টিজে বিনিয়োগের পরিমাণ ১২২ কোটি টাকা।

আদালতের আদেশে কম্বোডিয়ায় থাকা ১১৭টি বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট, ভারতে থাকা ৯টি বাড়ি ও ফ্ল্যাট, আরব আমিরাতে থাকা ৫৯টি বাড়ি ও ফ্ল্যাট, ভিয়েতনামে থাকা ৩০টি অ্যাপার্টমেন্ট ও ৩টি ফ্ল্যাট, মালয়েশিয়ায় থাকা ৪৭টি বাড়ি ও ফ্ল্যাট, থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে থাকা ২৩টি বাড়ি ও ফ্ল্যাট এবং ফিলিপাইনের ম্যানিলায় থাকা দুটি ফ্ল্যাট জব্দ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর আগে ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবরে দেওয়া আদেশে সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তার স্ত্রী রুকমীলা জামানসহ পরিবারের সদস্যদের নামে যুক্তরাজ্যে ৩৪৩টি, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশে বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট ও জমিসহ স্থাবর সম্পদ ক্রোক করা হয়। এসব সম্পদ ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ক্রয় করা হয়েছিল, যখন তিনি ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। এর আগে তিনি ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসির নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান ও পরিচালক ছিলেন।

তার স্ত্রী রুকমীলা জামান ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান ছিলেন এবং এই ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে বিপুল অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে আদালতের অপর এক আদেশে সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার পরিবারের নামে থাকা ৩৯টি ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ (অবরুদ্ধ) করা হয়, যেখানে ৫ কোটি ২৬ লাখ ৮৩ হাজার টাকা জমা রয়েছে। এছাড়া, দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১০২ কোটি টাকার শেয়ার এবং ৯৫৭ বিঘা জমি জব্দের আদেশও দেয় আদালত। ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার স্ত্রীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী শিকলবাহা এলাকার সিকদার বাড়ি থেকে অভিযান চালিয়ে দুদক সাবেক ভূমিমন্ত্রীর ২৩ বস্তা আলামত জব্দ করে, যার মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পাওয়া যায়। সূত্র : ঢাকা পোস্ট

চাটগাঁ নিউজ/এসএ

Scroll to Top